বেনাপোলের ধান্যখোলা সীমান্তে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার
আওয়ামী লীগ আমল থেকে সক্রিয় কথিত মাদক সিন্ডিকেটের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব ও সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে উঠছে গুরুতর প্রশ্ন
বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ
যশোরের বেনাপোলের শার্শা থানার সীমান্তবর্তী ধান্যখোলা এলাকায় মাদকের বিস্তার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় একাধিক সূত্রের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব, স্থানীয় আধিপত্য এবং সীমান্তকেন্দ্রিক যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি কথিত মাদক নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকেই এই নেটওয়ার্কের বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে যুক্ত বলে কথিত কিছু ব্যক্তি এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে আসছেন।
ধান্যখোলা এলাকার ৪ নম্বর ওয়ার্ডকে ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ের অভিযোগে আতিয়ার, মাসুদ, আশা, মজনু, তহিদুল ও মজিদসহ কয়েকজনের নাম আলোচনায় এসেছে। একই সঙ্গে নুর আলী নামে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট একজন স্থানীয় ব্যক্তির সঙ্গে কথিত যোগাযোগ ও সহযোগিতার অভিযোগও স্থানীয়ভাবে উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগের কোনোটিই আদালতের রায় বা সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থার চূড়ান্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য এই প্রতিবেদকের হাতে নেই। ফলে প্রতিবেদনে উল্লিখিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে কোনোভাবেই প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে না। বরং স্থানীয় পর্যায়ে ওঠা অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট প্রশ্ন এবং সম্ভাব্য তদন্তের প্রয়োজনীয়তাই অনুসন্ধানের বিষয় হিসেবে সামনে আনা হচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, ধান্যখোলা সীমান্তে মাদক কারবারের অভিযোগ যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে শুধু খুচরা বিক্রেতা বা বহনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বরং কথিত সরবরাহকারী, অর্থদাতা, পরিবহনকারী, স্থানীয় সমন্বয়কারী এবং নেটওয়ার্কের মূল নিয়ন্ত্রকদের শনাক্ত করা জরুরি।
সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় মাদকের অভিযোগ
বেনাপোল বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থলসীমান্ত এলাকা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, পণ্য আমদানি-রপ্তানি, যাত্রী চলাচল এবং সীমান্ত নিরাপত্তার কারণে এ অঞ্চলের গুরুত্ব জাতীয় পর্যায়ে অত্যন্ত বেশি।
এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত এলাকায় মাদক কারবারের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে তা শুধু স্থানীয় আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, জননিরাপত্তা, তরুণ সমাজ এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণের বিষয়ও জড়িত।
স্থানীয়দের প্রশ্ন—সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় যদি মাদক প্রবেশ, সরবরাহ বা পরিবহনের চেষ্টা হয়ে থাকে, তাহলে এর সঙ্গে জড়িত মূল ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হচ্ছে কি না।
কারা মাদক সংগ্রহ করে, কারা সীমান্তবর্তী এলাকায় তা গ্রহণ করে, কারা পরিবহন করে, কারা স্থানীয় পর্যায়ে বিতরণ করে এবং কারা এর অর্থনৈতিক লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আওয়ামী লীগ আমল থেকেই কথিত নেটওয়ার্ক?
স্থানীয় কয়েকটি সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ধান্যখোলা এলাকায় রাজনৈতিক পরিচয় ও স্থানীয় প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে একটি কথিত মাদক নেটওয়ার্ক শক্তিশালী হয়ে থাকতে পারে।
সূত্রগুলোর অভিযোগ, রাজনৈতিক যোগাযোগ ও স্থানীয় আধিপত্যের কারণে কোনো কোনো ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন।
তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজন—কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় থাকা নিজেই অপরাধের প্রমাণ নয়। কেউ আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, দলের সমর্থক ছিলেন বা কোনো রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল—এ তথ্যের ভিত্তিতে তাকে মাদক কারবারি হিসেবে চিহ্নিত করা সাংবাদিকতার দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়।
অভিযোগের সত্যতা প্রমাণের জন্য প্রয়োজন মামলা, মাদক উদ্ধার, গ্রেপ্তারের সরকারি রেকর্ড, তদন্ত প্রতিবেদন, আদালতের নথি, প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য, আর্থিক লেনদেনের তথ্য অথবা অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ।
অতএব রাজনৈতিক পরিচয় নয়—তদন্তের ভিত্তি হওয়া উচিত প্রমাণ।
আতিয়ারকে ঘিরে স্থানীয় অভিযোগ
স্থানীয়দের বক্তব্যে আতিয়ার নামে এক ব্যক্তির নাম মাদক কারবারের অভিযোগের সঙ্গে উঠে এসেছে।
স্থানীয় কয়েকটি সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ আমলে রাজনৈতিক প্রভাবের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল এবং এলাকায় তার একটি শক্তিশালী যোগাযোগবলয় রয়েছে।
তবে আতিয়ারের বিরুদ্ধে বর্তমানে কোনো মাদক মামলা রয়েছে কি না, অতীতে মাদকসহ গ্রেপ্তার হয়েছেন কি না অথবা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কিংবা পুলিশের কোনো তদন্তে তার নাম এসেছে কি না—এসব তথ্য সরকারি নথি যাচাই ছাড়া নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
তাই আতিয়ারকে ঘিরে স্থানীয় অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট থানার মামলা রেকর্ড, আদালতের নথি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
মাসুদের বিরুদ্ধে গাঁজা কেনাবেচার অভিযোগ
মাসুদ নামে আরেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে গাঁজা কেনাবেচার অভিযোগ স্থানীয় পর্যায়ে রয়েছে বলে একাধিক সূত্র দাবি করেছে।
স্থানীয়দের কেউ কেউ তাকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী একটি পরিবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলেও উল্লেখ করেছেন।
তবে কারও রাজনৈতিক পরিচয়, পারিবারিক সম্পর্ক কিংবা কোনো দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততাকে মাদক অপরাধের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
মাসুদের বিরুদ্ধে যদি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে কোনো মামলা, গ্রেপ্তার বা তদন্ত থেকে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি থেকেই তার সত্যতা যাচাই করা সম্ভব।
প্রশ্ন হচ্ছে—স্থানীয় পর্যায়ে ওঠা অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে কোনো অনুসন্ধান বা তদন্ত করেছে কি না।
‘আশা’কে ঘিরে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ
ধান্যখোলা ৪ নম্বর ওয়ার্ডে ‘আশা’ নামে একজনকে স্থানীয় পর্যায়ে কথিত প্রভাবশালী মাদক কারবারি হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের একটি অংশ তাকে কথিত মাদক নেটওয়ার্কের ‘গডফাদার’ হিসেবেও অভিহিত করছেন।
তবে ‘গডফাদার’ শব্দটি অত্যন্ত গুরুতর এবং এর ব্যবহার কোনো ব্যক্তির সামাজিক ও ব্যক্তিগত সুনামের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শক্ত প্রমাণ ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে ‘গডফাদার’ হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করা যায় না।
বরং প্রশ্ন হলো—আশার বিরুদ্ধে কোনো মাদক মামলা রয়েছে কি না, মাদক উদ্ধারসংক্রান্ত কোনো ঘটনায় তার নাম এসেছে কি না, তার বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত হয়েছে কি না এবং স্থানীয় অভিযোগের পেছনে কী ধরনের প্রমাণ রয়েছে।
অভিযোগ সত্য হলে তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন—মাদক কোথা থেকে আসে, কারা সরবরাহ করে, কোথায় মজুত হয়, কারা পরিবহন করে, স্থানীয় পর্যায়ে কারা বিতরণ করে এবং অর্থের প্রবাহ কোন দিকে যায়।
মজনু, তহিদুল ও মজিদের নামও আলোচনায়
স্থানীয় সূত্রগুলোর বক্তব্যে মজনু, তহিদুল ও মজিদসহ আরও কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে।
তবে তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে কী ধরনের অভিযোগ রয়েছে, সেই অভিযোগের ভিত্তি কী, তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়েছে কি না অথবা কোনো মাদক উদ্ধার বা গ্রেপ্তার ঘটনায় তাদের নাম এসেছে কি না—এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
একটি বড় মাদক নেটওয়ার্ক থাকলে সেখানে সাধারণত একাধিক স্তরে লোকজন কাজ করতে পারে। সরবরাহকারী, পরিবহনকারী, স্থানীয় বিক্রেতা, অর্থ সংগ্রাহক, যোগাযোগ রক্ষাকারী এবং কথিত নিয়ন্ত্রকদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ থাকতে পারে।
তাই শুধু কয়েকজন কথিত খুচরা বিক্রেতাকে আটক করলেই যদি মূল নেটওয়ার্ক অক্ষত থাকে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে।
নুর আলীকে ঘিরে রাজনৈতিক যোগাযোগের অভিযোগ
স্থানীয় সূত্রের বক্তব্যে নুর আলী নামে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট একজন স্থানীয় ব্যক্তির নামও এসেছে।
স্থানীয় পর্যায়ের অভিযোগ, কথিত মাদক কারবারিদের সঙ্গে তার যোগাযোগ বা সহযোগিতার সম্পর্ক থাকতে পারে।
তবে এই অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রামাণ্য নথি প্রতিবেদকের হাতে নেই। ফলে নুর আলীর বিরুদ্ধে কোনো অপরাধ সংঘটনের অভিযোগকে সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে না।
বরং প্রশ্ন হচ্ছে—তার বিরুদ্ধে যদি কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থেকে থাকে, সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তা যাচাই করেছে কি না এবং কোনো সরকারি তদন্ত বা মামলা নথিতে তার নাম আছে কি না।
বিজিবির সহযোগিতার অভিযোগ—সবচেয়ে স্পর্শকাতর প্রশ্ন
ধান্যখোলা সীমান্তে মাদক কারবারের অভিযোগের সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কোনো কোনো সদস্যের কথিত সহযোগিতার অভিযোগও উঠেছে।
কয়েকটি সূত্রের দাবি, সীমান্ত এলাকায় মাদক কারবার পরিচালনার ক্ষেত্রে অসাধু কোনো সদস্যের সহযোগিতা পাওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।
তবে কোনো নির্দিষ্ট বিজিবি সদস্যের নাম, পদবি, ইউনিট, অর্থ লেনদেন, নির্দিষ্ট ঘটনার বিবরণ কিংবা প্রত্যক্ষ সহযোগিতার প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে নেই।
ফলে পুরো বিজিবিকে কোনোভাবেই অভিযুক্ত করা হচ্ছে না।
বরং যদি কোনো নির্দিষ্ট সদস্যের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অভ্যন্তরীণ তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই করা প্রয়োজন।
সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সুনামের স্বার্থেও এ ধরনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার দায় পুরো বাহিনীর ওপর চাপানো যেমন ন্যায়সংগত নয়, তেমনি কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য হলে সেটি আড়াল করাও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর।
মাদক কারবারের অর্থের উৎস কোথায়?
মাদক কারবারের তদন্তে শুধু মাদক উদ্ধার বা বহনকারীকে গ্রেপ্তার করাই যথেষ্ট নয়।
মূল প্রশ্ন হলো—এই অবৈধ ব্যবসার অর্থ কোথায় যাচ্ছে?
কারা অর্থ সংগ্রহ করছে?
কারা বড় অঙ্কের লেনদেন পরিচালনা করছে?
কোন মাধ্যমে টাকা স্থানান্তর করা হচ্ছে?
কারও আয় ও সম্পদের মধ্যে অস্বাভাবিক পার্থক্য রয়েছে কি না?
হঠাৎ কারও জমি, বাড়ি, গাড়ি বা ব্যবসায় বড় ধরনের বিনিয়োগ হয়েছে কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর আইনসম্মত তদন্তের মাধ্যমে খুঁজে বের করা গেলে কথিত মাদক নেটওয়ার্কের আর্থিক কাঠামো সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
তবে আর্থিক তদন্তের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আইনগত অধিকার ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
সীমান্তের যোগাযোগ ও চলাচলের তথ্য যাচাইয়ের দাবি
সীমান্তকেন্দ্রিক কোনো মাদক নেটওয়ার্ক থাকলে সেটি সাধারণত বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হওয়ার কথা নয়। সরবরাহকারী, পরিবহনকারী, স্থানীয় বিক্রেতা এবং অর্থের মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে কোনো না কোনো ধরনের যোগাযোগ থাকার সম্ভাবনা থাকে।
তাই অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে আইনগত অনুমোদনের আওতায় প্রয়োজনীয় তথ্য পর্যালোচনা করা যেতে পারে।
সীমান্তে চলাচলের রেকর্ড, মামলার নথি, মাদক উদ্ধারের তথ্য, গ্রেপ্তারের রেকর্ড এবং বৈধ তদন্ত প্রক্রিয়ার আওতায় প্রাসঙ্গিক আর্থিক তথ্য বিশ্লেষণ করা হলে প্রকৃত নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করা সহজ হতে পারে।
তবে কোনো ব্যক্তিগত তথ্য বেআইনিভাবে সংগ্রহ বা প্রকাশ না করে যথাযথ আইন ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই তদন্ত পরিচালনা করতে হবে।
রাজনৈতিক পরিচয় নয়, প্রমাণই হোক তদন্তের ভিত্তি
মাদক কারবার একটি গুরুতর অপরাধ। কিন্তু মাদকবিরোধী অভিযানকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার বানানোও সমানভাবে অনুচিত।
কেউ আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলেই তিনি অপরাধী নন।
আবার কেউ কোনো রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ করলে সেই পরিচয় তাকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখতে পারে না।
অতএব ধান্যখোলা সীমান্তে মাদক কারবারের অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধের প্রমাণই হওয়া উচিত মূল বিবেচ্য।
অভিযোগ সত্য হলে যে রাজনৈতিক পরিচয়ই থাকুক না কেন, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। আর অভিযোগ মিথ্যা হলে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে কাউকে হয়রানি বা সামাজিকভাবে হেয় করাও গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রশাসনের কাছে স্থানীয়দের একাধিক প্রশ্ন
ধান্যখোলা এলাকায় মাদক কারবারের অভিযোগ ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে বেশ কিছু প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
ধান্যখোলা ৪ নম্বর ওয়ার্ডে মাদক কারবারের বিষয়ে প্রশাসনের কাছে আগে কোনো লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না?
কোনো সাধারণ ডায়েরি বা মামলা হয়েছে কি না?
মাদক উদ্ধারসংক্রান্ত কোনো ঘটনায় এই এলাকার কারও নাম এসেছে কি না?
কেউ মাদক মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছে কি না?
সীমান্ত থেকে স্থানীয় এলাকায় মাদক প্রবেশ বা সরবরাহের কোনো নির্দিষ্ট তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে রয়েছে কি না?
কোনো রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম তদন্তে এসেছে কি না?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—মাদক কারবারের কথিত মূল অর্থদাতা, সরবরাহকারী ও নিয়ন্ত্রকদের শনাক্ত করতে কোনো তদন্ত চলছে কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর প্রকাশ্যে এলে ধান্যখোলা সীমান্তের প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের কাছে একটি পরিষ্কার ধারণা তৈরি হতে পারে।
তরুণ প্রজন্ম নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
মাদকের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ে তরুণ প্রজন্মের ওপর।
একটি সীমান্ত এলাকায় মাদক সহজলভ্য হয়ে উঠলে শুধু মাদকাসক্তির হার বাড়ার আশঙ্কাই থাকে না; এর সঙ্গে পারিবারিক অশান্তি, চুরি, ছিনতাই, কিশোর অপরাধ, সহিংসতা এবং নানা সামাজিক সংকটও তৈরি হতে পারে।
তাই ধান্যখোলা এলাকায় মাদকের অভিযোগকে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান দিয়ে দেখলে হবে না।
পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন, ধর্মীয় ও স্থানীয় নেতৃত্ব এবং প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বিশেষ করে তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, সচেতনতামূলক কর্মসূচি এবং সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
শুধু ছোট বিক্রেতা নয়, মূল নেটওয়ার্ক শনাক্তের দাবি
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালিত হলে শুধু ছোটখাটো বিক্রেতা বা বহনকারীদের আটক করে অভিযান শেষ করা হবে না।
যদি তদন্তে কোনো বড় নেটওয়ার্কের অস্তিত্ব পাওয়া যায়, তাহলে তার সরবরাহকারী, অর্থদাতা, পরিবহনকারী, স্থানীয় সমন্বয়কারী এবং মূল নিয়ন্ত্রকদের শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
একই সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক যোগাযোগ কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কারও দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
কারণ মাদক কারবারের মূল শক্তি যদি অর্থ, প্রভাব ও যোগাযোগ হয়ে থাকে, তাহলে শুধু মাঠপর্যায়ের বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান পাওয়া কঠিন।
নিরপেক্ষ তদন্তই পারে প্রকৃত সত্য সামনে আনতে
ধান্যখোলা সীমান্তে মাদক বিস্তারের অভিযোগ কতটা সত্য, তার উত্তর রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়—নিরপেক্ষ তদন্তেই পাওয়া সম্ভব।
স্থানীয় অভিযোগগুলো যাচাই করতে পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, বিজিবি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন হতে পারে।
তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনা উচিত।
আর যদি কোনো অভিযোগ মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রমাণিত হয়, তাহলে নির্দোষ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার বন্ধ করাও প্রশাসনের দায়িত্ব।
প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা জরুরি
সীমান্তবর্তী এলাকার মাদক সমস্যা মোকাবিলায় শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না। মাদকের উৎস, সরবরাহপথ, স্থানীয় বিতরণব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক কাঠামো চিহ্নিত করার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সাধারণ মানুষ ও সংবাদমাধ্যমের কাছ থেকে পাওয়া অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।
কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে তাকে হয়রানি না করে যথাযথ প্রমাণ সংগ্রহ এবং আইনি প্রক্রিয়ায় তদন্ত পরিচালনা করা উচিত।
একইভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে বাহিনীর ভাবমূর্তি রক্ষার স্বার্থেই অভিযোগটি নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়া হবে
এই প্রতিবেদনে আতিয়ার, মাসুদ, আশা, মজনু, তহিদুল, মজিদ ও নুর আলীসহ যাদের নাম স্থানীয় অভিযোগের সূত্রে এসেছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগকে আদালত কর্তৃক প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে না।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাদের বক্তব্য, প্রতিবাদ, ব্যাখ্যা বা প্রমাণসহ অবস্থান জানালে তা সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুসরণ করে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করা হবে।
একইভাবে বিজিবির কোনো নির্দিষ্ট সদস্যের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণ সামনে এলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
উপসংহার
যশোরের বেনাপোলের শার্শা থানার সীমান্তবর্তী ধান্যখোলা এলাকায় মাদক বিস্তারের অভিযোগ স্থানীয় সমাজে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
আওয়ামী লীগ আমল থেকে একটি কথিত রাজনৈতিক প্রভাবশালী মাদক নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠার অভিযোগ, কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে মাদক কারবারের অভিযোগ এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কোনো কোনো সদস্যের কথিত সহযোগিতার দাবি—সব মিলিয়ে বিষয়টি একটি নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক তদন্তের দাবি রাখে।
তবে অভিযোগ আর প্রমাণ এক বিষয় নয়।
সাংবাদিকতার দায়িত্ব হলো অভিযোগকে সামনে আনা, প্রশ্ন তোলা, জনস্বার্থের বিষয়গুলো অনুসন্ধান করা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তিকে যথাযথ প্রমাণ ছাড়া অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে ঘোষণা না করাও সাংবাদিকতার মৌলিক দায়িত্ব।
ধান্যখোলা সীমান্তে যদি সত্যিই কোনো মাদক নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকে, তাহলে সেই নেটওয়ার্কের শিকড় কোথায়, কারা মাদক সরবরাহ করে, কারা পরিবহন করে, কারা স্থানীয় পর্যায়ে বিতরণ করে, কারা অর্থের জোগান দেয় এবং কারা প্রভাব বা যোগাযোগ ব্যবহার করে তাদের কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়তা করে—এসব প্রশ্নের উত্তর বের করা এখন সময়ের দাবি।
একই সঙ্গে কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যেন মিথ্যা অভিযোগের কারণে সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও সীমান্তরক্ষী কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান—ধান্যখোলা সীমান্তে মাদক কারবারের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হোক। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক; আর অভিযোগ মিথ্যা হলে নির্দোষ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারও বন্ধ করা হোক।
বিশেষ সতর্কীকরণ: প্রতিবেদনে উল্লিখিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে যেসব অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো স্থানীয় সূত্রের বক্তব্য ও অভিযোগের ভিত্তিতে উপস্থাপিত। এসব অভিযোগ আদালত বা সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত প্রতিবেদনে উল্লিখিত কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও প্রাসঙ্গিক সরকারি নথি পাওয়া গেলে প্রতিবেদনের পরবর্তী সংস্করণে তা যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
বিজ্ঞ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকলেও এলাকায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে আওয়ামীলীগ নেতা আশা। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের শাসনামলে চাদাঁবাজি,চুরি,জমি দখল,মাদক ব্যবসা পরিচালনা,অবৈধ বালুর ব্যবসা,বাওড় দখলের মত নানা অপরাধ মূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেও বাহাদুরপুর ইউনিয়নের আলোচিত আশা বাহিনীর প্রধান আশা হোসেন( ৪৫)ধরা ছোঁয়ার বাইরে।
আশা বেনাপোল পোর্ট থানাধীন ধান্যখোলা গ্রামের মৃত আনু কামারের ছেলে। গুঞ্জন রয়েছে এক প্রভাবশালী বিএনপি নেতার ছত্র ছায়ায় এলাকায় অবৈধ মাদক ব্যবসা চালাচ্ছে আশা।
স্থানীয় গ্রামবাসীর দেওয়া তথ্য সূত্রে জানা যায়,আওয়ামী সরকারের পতনের পর আশার দলীয় প্রভাব না থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের সাথে পূর্ব সখ্যতার জেরে সে চুটিয়ে গাঁজার ব্যবসা করছেন। সরকার বদলের পালায় আওয়ামীলীগের অনেক নিরপরাধ নেতা-কর্মী এলাকা ছাড়লেও আশার মত চিহ্নিত অপরাধী প্রকাশ্য ঘুরে বেড়ায়। এ নিয়ে জনমনে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। আশা ও তার সহযোগীদের অত্যাচার, হামলা,মামলার স্বীকার ভুক্তভোগীরা অদৃশ্য শক্তির কারণে ন্যায্য বিচার পাচ্ছে না বলে আরো জানান।
বেনাপোল পোর্টথানা সুত্রে জানা যায়, ২০২১ সালের ১০এপ্রিল সাংবাদিকদের তার সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে অবৈধ ভাবে আটকিয়ে মারপিট করে তাদের কাছে থাকা মোবাইল ফোন ও ক্যামেরা চুরির অভিযোগে আশা ও তার তিন সহযোগীর নামে মামলা রুজু হয়। যাহার মামলা নং- ১৩/১৬৯ ও ধারা ৩২৩/৩৪২/৩৭৯/৫০৬ পেনাল কোড-১৮৬০। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সাব ইন্সেপেক্টর (নিরস্ত্র) মোঃ রফিকুল ইসলাম তদন্ত শেষে এই মামলায় অভিযুক্তদের নামে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন।
সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের বিজ্ঞ আদালত সূত্রে জানা যায়,মামলাটির বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং আসামী আশা হোসেনের নামে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা জারি রয়েছে।
এ বিষয়ে বেনাপোল পোর্ট থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ আশরাফ হোসেনের নিকট জানতে চাইলে বলেন মোঃ আশা হোসেন নামে থানায় কোন আসামীর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নাই। মাদক ব্যবসা পরিচালনার বিষয়টি খতিয়ে দেখে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া