
মেয়রের আসনে কর্মীর রক্ত: এসআই বদিউল ও শাকিলদের বিচার না হলে কিয়ামতে ডা. শাহাদাতকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাবেন ফেরদৌস!
নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম |
“সাহাদাত ভাই, আপনি আজ যে মেয়রের চেয়ারে বসেছেন, সেখানে আমার শরীরের রক্ত আর তাজা ঘাম লেগে আছে। সেই চেয়ারের পায়ায় লেখা আছে আমার পঙ্গুত্বের ইতিহাস আর গ্রেফতারের সেই অভিশপ্ত তারিখ।”—বর্তমান চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের উদ্দেশ্যে এভাবেই নিজের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ আর আজন্ম হাহাকার উগরে দিয়েছেন চট্টগ্রাম মহানগর যুবদলের সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক ও ছাত্রদলের ১৭ বছরের নির্বাচিত লড়াকু সেক্রেটারি মোঃ ফেরদৌস আলম ফেরদৌস।
জিয়া কিশোর সংগঠন থেকে শুরু করে জীবনের দীর্ঘ ৩৪টি বছর যে দলের জন্য রাজপথে বিলিয়ে দিয়েছেন, সেই দলেরই শাসনামলে আজ বিচারের আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন এই পঙ্গুপ্রায় নেতা।
পিস্তল ঠেকিয়ে কেন্দ্র দখল ও সেই পৈশাচিক তান্ডব
ঘটনাটি ছিল চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের সেই কলঙ্কিত দিনে, ১০নং উত্তর কাট্টলী বিশ্বাস পাড়া ভোটকেন্দ্রে। ফেরদৌস আলম সেখানে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের আজ্ঞাবহ এসআই বদিউল আলমের প্রত্যক্ষ মদদে এবং এসআই শাকিলের নেতৃত্বে তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা চালানো হয়। এসআই বদিউল প্রকাশ্য দিবালোকে পিস্তল ঠেকিয়ে একের পর এক ধানের শীষের এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দিচ্ছিল। এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গেলেই ফেরদৌস আলমের ওপর শুরু হয় পৈশাচিক হায়েনাদের তান্ডব।
৩টি লাঠি ভাঙা এবং ৩০০০ গজ ‘কুকুরের মতো’ টেনে নেওয়ার বীভৎসতা
নৃশংসতার বর্ণনা দিতে গিয়ে ফেরদৌস আলম কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, "আমাকে শত শত মানুষের সামনে মাটিতে ফেলে তারা এমনভাবে পিটিয়েছে যে, আমার শরীরের ওপর পুলিশের ৩টি লাঠি ভেঙে টুকরো হয়ে গিয়েছিল। আমি জ্ঞান হারানোর পর তারা আমার দুই হাত ও দুই পা ধরে পশুর মতো রাস্তা দিয়ে প্রায় ৩০০০ গজ (৩ কিমি) টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে পুলিশের গাড়িতে তোলে।" এই মধ্যযুগীয় বর্বরতা প্রত্যক্ষ করেও সেদিন কেউ এগিয়ে আসার সাহস পায়নি প্রশাসনের রক্তচক্ষুর কারণে।
মৃত্যুভয় ও গভীর রাতের সেই ‘ক্রসফায়ার’ আতঙ্ক
অর্ধমৃত অবস্থায় তাকে গ্রেফতার করে যখন গভীর রাতে লক-আপ থেকে বের করা হয়, তখন চারদিকে ছিল ফ্যাসিস্ট সরকারের ‘ক্রসফায়ার’ কালচার। ফেরদৌস আলম স্মৃতিচারণ করেন, "সেদিন মনে হয়েছিল আজই আমার জীবনের শেষ রাত। কেন এতো রাতে মেডিকেলে নেওয়ার নাম করে আমাকে বের করা হচ্ছে—সেই আতঙ্কে আমি কুঁকড়ে গিয়েছিলাম।" সেই দিনের সেই আঘাতের কারণে আজও তিনি ঘাড় ও মেরুদণ্ডের সমস্যায় প্রায় পঙ্গু। দিন দিন তার শরীরের নিচের অংশ অবশ হয়ে যাচ্ছে, যা তাকে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
৩৪ বছরের ত্যাগের কি এই প্রতিদান?
রাজপথের এই পরীক্ষিত নেতা আজ বড়ই একা ও নিঃস্ব। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, "এসআই বদিউল আর শাকিলের যদি বিচার না হয়, তবে আমি ধরে নেবো এই দলের পেছনে নিজের জীবনের ৩৪টি বছর বিলিয়ে দেওয়া ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্ত।" তিনি সরাসরি মেয়রকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি দুনিয়ার আদালতে এই ‘জানোয়ারদের’ বিচার ডা. শাহাদাত নিশ্চিত না করেন, তবে রোজ কিয়ামতে তিনি মেয়রের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে নালিশ দেবেন।
তৃণমূলের দাবি ও চূড়ান্ত শাস্তি:
ফেরদৌস আলমের ওপর এই বর্বরোচিত হামলার প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছে চট্টগ্রামের তৃণমূল রাজনীতি। তারা অবিলম্বে ৩টি সুনির্দিষ্ট দাবি জানিয়েছেন: ১. যাবজ্জীবন কারাদণ্ড: 'নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩' অনুযায়ী এসআই বদিউল ও শাকিলকে গ্রেফতার করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিতে হবে। ২. স্থায়ী চাকরিচ্যুতি: পুলিশের পবিত্র পোশাক কলঙ্কিত করায় তাদের আজীবনের জন্য বহিষ্কার করতে হবে। ৩. ক্ষতিপূরণ ও চিকিৎসা: পঙ্গুত্বের শিকার এই নেতার উন্নত চিকিৎসা ও রাষ্ট্রীয় ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে।
চট্টগ্রামের রাজপথে ৩৪ বছর ঘাম ঝরানো এই নেতার আর্তনাদ এখন বিচারের প্রতীক্ষায়। খুনি বদিউল ও শাকিলদের বিচার না হলে এই দীর্ঘ ত্যাগ অর্থহীন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন উত্তর কাট্টলীসহ চট্টগ্রামের সাধারণ নেতাকর্মীরা।