বিশেষ প্রতিনিধি | বাঞ্ছারামপুর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)
চিকিৎসাবিদ্যার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সনদ নেই, নেই বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (BMDC) বা কোনো স্বীকৃত আয়ুর্বেদিক/ইউনানী বোর্ডের ন্যূনতম নিবন্ধন। অথচ নামের পাশে ‘কমান্ডার’ পদবি যুক্ত করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার রূপসদী মধ্যপাড়া এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে অপচিকিৎসার এক বিশাল সাম্রাজ্য। ‘আমির আলী ফকির কমান্ডার’ নামের এক ব্যক্তি অলৌকিক উপায়ে ক্যান্সারসহ সকল জটিল ও কঠিন ব্যাধি নিরাময়ের মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের সাথে রমরমা প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। একটি প্রাইভেট ইউনানী ওষুধ কোম্পানির সাধারণ প্রত্যয়নপত্রকে মূল সরকারি লাইসেন্স হিসেবে প্রদর্শন করে এবং ধর্মীয় অনুভূতি ও অন্ধবিশ্বাসকে পুঁজি করে চলছে এই বেআইনি কার্যক্রম।
অপচিকিৎসার শিকার হয়ে একদিকে যেমন হাজার হাজার টাকা হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা সহজ-সরল মানুষ, অন্যদিকে সঠিক চিকিৎসার অভাবে রোগীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি পৌঁছাচ্ছে জীবনহানির চরম পর্যায়ে।
সরেজমিনে আস্তানা ও প্রতারণার কৌশল
বাঞ্ছারামপুর উপজেলার রূপসদী মধ্যপাড়া এলাকায় সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা যায়, আমির আলী ফকির তার আস্তানায় বিশালাকার সাইনবোর্ড টাঙিয়ে প্রচার চালাচ্ছেন—ক্যান্সার, পক্ষাঘাত, বন্ধ্যাত্ব, দীর্ঘমেয়াদী ব্যথা, মানসিক রোগসহ যেকোনো কঠিন ব্যাধি অলৌকিক উপায়ে ভালো করা হয়।
প্রতিদিন ভোর থেকেই দেশের বিভিন্ন দূর-দূরান্ত থেকে আসা শত শত ভুক্তভোগী মানুষের ভিড় জমে এই আস্তানায়। রোগীদের আকৃষ্ট করতে এবং নিজের ভুয়া অবস্থান জাহির করতে তিনি একটি ইউনানী ওষুধ কোম্পানির ছোট একটি প্রত্যয়নপত্র দেওয়াল ও টেবিলে ঝুলিয়ে রাখেন। সাধারণ ও অশিক্ষিত মানুষ সেটিকে সরকারি অনুমোদন বা ডাক্তারি সনদ মনে করে বিভ্রান্ত হচ্ছেন।
কথিত চিকিৎসার নামে রোগীদের দেওয়া হচ্ছে অজ্ঞাত বনাজী ওষুধ, গাছের ছাল-বাকল, পানি পড়া, তেল পড়া এবং নানাবিধ তাবিজ-কবচ। বিনিময়ে ফি, ওষুধের দাম এবং অলৌকিক দোয়ার নামে এক এক জন রোগীর কাছ থেকে ধাপে ধাপে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে ৫ হাজার থেকে শুরু করে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
ভুক্তভোগীদের চোখের জল ও ক্ষোভের বিস্ফোরণ
অভিযোগের সত্যতা মিলছে সরাসরি ভুক্তভোগীদের মুখে। প্রতারণার শিকার হয়ে শারীরিক ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত একাধিক পরিবার তাদের ক্ষোভ ও আকুতি প্রকাশ করেছেন।
ইয়াছমিন আক্তার নামে এক ভুক্তভোগী চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:
"আমার শরীরে দীর্ঘদিনের মেরুদণ্ড ও হাড়ের ব্যথা ছিল। ভালো হওয়ার আশায় আমির আলী ফকিরের আস্তানায় যাই। সে আমাকে বড় বড় কথা বলে কিছু বনাজী ওষুধ ও তাবিজ দিয়ে প্রথম দফায় ১০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়। কিন্তু ওষুধ খাওয়ার পর ব্যথা কমা তো দূরের কথা, আমার পেটে প্রচণ্ড জ্বালাপোড়া ও বমি শুরু হয়। পরে সরকারি হাসপাতালে গিয়ে জানতে পারি, আমাকে ক্ষতিকর ও বিষাক্ত দ্রবণ দেওয়া হয়েছিল। আমি এখন সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী। সে চিকিৎসার নামে মানুষের জীবন ধ্বংস করছে।"
একইভাবে অলৌকিক ক্ষমতার গুজবে বিশ্বাস করে প্রতারিত হয়েছেন দেলোয়ারা বেগম। অশ্রুসজল চোখে তিনি জানান:
"লোকমুখে শুনেছিলাম ফকির সাহেবের অলৌকিক ক্ষমতা আছে, হাত দিলেই নাকি রোগ ভালো হয়। আমার স্বজনের জটিল রোগের জন্য গিয়েছিলাম। সে ইউনানী কোম্পানির একটি কাগজ দেখিয়ে নিজেকে বড় ডিগ্রিধারী ডাক্তার দাবি করে। আমরা সরল বিশ্বাসে তার হাতে জমানো টাকা তুলে দিই। কিন্তু কোনো কাজই হয়নি। পরে বুঝতে পারি সে পুরোটাই ভন্ড ও ভুয়া। সাধারণ মানুষের সরলতাকে কাজে লাগিয়ে সে কোটিপতি হচ্ছে।"
অভিযোগের বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা পিয়ারা বেগম বলেন:
"আমার এক মারাত্মক অসুস্থ আত্মীয়কে নিয়ে গিয়েছিলাম। সে প্রথম দিনই গ্যারান্টি দিয়ে বলেছিল ১০০% ভালো হয়ে যাবে। কিন্তু দিন দিন রোগীর অবস্থা আরও সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। এলাকার সাধারণ মানুষ তার সন্ত্রাসী ও প্রভাবশালীদের ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পায় না। সে মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে, আমরা এর কঠোর বিচার চাই।"
স্থানীয় বাসিন্দা আলী আকবর বলেন:
"আমির আলী ফকিরের কোনো পড়াশোনা বা কবিরাজি শেখার প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা নেই। সে একজন প্রতারক। এলাকায় দরিদ্র ও অশিক্ষিত মানুষকে টার্গেট করে এই ব্যবসা ফেঁদে বসেছে। প্রশাসন যদি এখনই ব্যবস্থা না নেয়, তবে আরও বহু মানুষের প্রাণ যাবে।"
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় যুবক জানান, ইউনানী কোম্পানির একটি সাধারণ কাগজকে লাইসেন্স বানিয়ে চেম্বার বানিয়ে বসেছে আমির আলী। তার প্রলোভনে পড়ে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে সাধারণ মানুষ এসে সর্বস্ব হারাচ্ছে।
বিদ্যমান আইন ও স্বাস্থ্য নীতিমালার ভয়াবহ লঙ্ঘন
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আমির আলী ফকিরের এই কার্যক্রম একাধিক প্রচলিত আইনের সরাসরি লঙ্ঘন এবং চরম দণ্ডনীয় অপরাধ।
মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল আইন, ২০১০ (ধারা ২৯ ও ২৮):
এমবিবিএস বা বিডিএস ডিগ্রি ছাড়া কেউ ‘ডাক্তার’ পদবি ব্যবহার করতে পারবেন না। নিবন্ধিত চিকিৎসক ব্যতীত অপচিকিৎসা দিলে বা নিজেকে ভুয়া চিকিৎসক দাবি করলে তা ৩ বছরের কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় অপরাধ।
দ্য অলটারনেটিভ মেডিকেল অ্যান্ড ইউরবেদিক/ইউনানী প্র্যাকটিশনার্স আইন:
ইউনানী বা বনাজী চিকিৎসার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় বোর্ড থেকে স্বীকৃত প্রাতিষ্ঠানিক সনদ ও নিবন্ধন থাকা বাধ্যতামূলক। কোনো ওষুধ কোম্পানির প্রত্যয়নপত্রকে চিকিৎসার লাইসেন্স হিসেবে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০ (Penal Code - ধারা ৪১৭, ৪২০ ও ৩০৭):
ভুয়া পরিচয় দিয়ে প্রতারণা (ধারা ৪২০), অর্থ আত্মসাৎ এবং অসচ্ছল মানুষকে প্রতারণামূলক ভুল ওষুধ দিয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলা বা জীবন বিপন্ন করার অপরাধে যাবজ্জীবন বা দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ (ধারা ৪৪ ও ৫৩):
সেবার নামে মিথ্যা বিজ্ঞাপন, ভুয়া আশ্বাস এবং স্বাস্থ্যের ক্ষতি সাধন করলে মেয়াদী কারাদণ্ড ও মোটা অংকের জরিমানার স্পষ্ট বিধান রয়েছে।
বিচার, আইনগত ব্যবস্থা ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের জরুরি হস্তক্ষেপের দাবি
বাঞ্ছারামপুরের সচেতন সমাজ ও ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের দাবি এখন একটাই—অবিলম্বে এই অপচিকিৎসা ও রমরমা বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে।
এলাকাবাসী যৌথভাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসক, বাঞ্ছারামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (UNO), বাঞ্ছারামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (OC) এবং জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের জরুরি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
জনস্বার্থে এলাকাবাসীর মূল দাবিগুলো:
জরুরি মোবাইল কোর্ট: অবিলম্বে উপজেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বয়ে আমির আলী ফকিরের রূপসদী মধ্যপাড়ার আস্তানায় অতর্কিত অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালত (Mobile Court) পরিচালনা করতে হবে।
আস্তানা সিলগালা ও মালামাল বাজেয়াপ্ত: অবৈধ চেম্বার ও প্রতারণার আস্তানা স্থায়ীভাবে সিলগালা করতে হবে এবং সেখান থেকে জব্দকৃত ভুয়া ওষুধ ও ক্ষতিকর দ্রবণ ল্যাব পরীক্ষার জন্য পাঠাতে হবে।
দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি: ভুক্তভোগীদের অর্থ ফেরত নিশ্চিতসহ দণ্ডবিধির ৪২০ ও বিএমডিসি আইনে নিয়মিত মামলা দায়ের করে প্রতারক আমির আলী ফকিরকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ মানুষের জীবন নিয়ে এমন ব্যবসা করার সাহস না পায়।
প্রশাসনের দ্রুত ও কার্যকরী পদক্ষেপই পারে রূপসদী মধ্যপাড়ার এই ভন্ড কবিরাজের প্রতারণা থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে। এখন দেখার বিষয়, স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসন কখন এই ভুয়া চিকিৎসকের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে।