ভারতে হিন্দুত্ব সন্ত্রাস ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি: মালেগাঁও বিস্ফোরণ থেকে মুম্বাই হামলা পর্যন্ত অন্ধকার অধ্যায়
২ আগস্ট ২০২৫, ঢাকা
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ | জনতার কণ্ঠস্বর
ভারতের মালেগাঁও বিস্ফোরণের মামলায় সাম্প্রতিক রায়ে নির্দোষ ঘোষিত হয়েছেন হিন্দুত্ববাদী বিজেপি নেত্রী সাধ্বী প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল প্রসাদ পুরোহিত। ২০০৮ সালে রমজান মাসে মালেগাঁও শহরে ভয়াবহ বিস্ফোরণে নিহত হন ৯ জন নিরীহ মুসলমান, যাদের রক্তের দাগ আজো ভারতের বিচারব্যবস্থার বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করে রেখেছে।
মালেগাঁওয়ের রক্তাক্ত অধ্যায়
সেই ঘটনায় মহারাষ্ট্রের অ্যান্টি টেরোরিজম স্কোয়াড (ATS) এক বিস্ফোরক তথ্য সামনে নিয়ে আসে—ঘটনার পেছনে ছিলো হিন্দুত্ববাদী চরমপন্থীদের একটি সংগঠিত নেটওয়ার্ক। তদন্তে উঠে আসে, হামলায় ব্যবহৃত মোটরবাইকটি ছিলো সাধ্বী প্রজ্ঞার নামে নিবন্ধিত। পরে ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থা (NIA) নিশ্চিত করে—এই হামলা পরিকল্পিতভাবে মুসলমানদের লক্ষ্য করে করা হয়েছিলো এবং এতে জড়িত ছিলো হিন্দুত্ববাদী সামরিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা।
হেমন্ত কারকারে: সত্য বলার দায়ে শহীদ?
এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ATS প্রধান হেমন্ত কারকারে প্রকাশ্যে বলেছিলেন যে, ডিসেম্বরে তিনি গোটা হিন্দুত্ব সন্ত্রাস নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে হোয়াইট পেপার প্রকাশ করবেন। কিন্তু নভেম্বরেই ঘটে যায় মুম্বাই হামলার রহস্যময় ট্র্যাজেডি—সেখানে কারকারে নিহত হন।
অভিযোগ রয়েছে, তার শরীরে যে ধরনের গুলির চিহ্ন পাওয়া গিয়েছিলো (৯ মিমি পিস্তল), তা পাকিস্তানি হামলাকারীদের অস্ত্রের সঙ্গে মেলে না। ফলে তার মৃত্যু ‘সন্ত্রাসবাদী হামলায়’ নয় বরং ‘ভিতরের কারও হাতে’ হয়েছে কি না—এই প্রশ্ন বহু বছর ধরে উত্থাপিত হয়ে আসছে।
রহস্যজনকভাবে হারিয়ে যাওয়া সাক্ষী ও আসামী
মালেগাঁও মামলার আরেক গুরুত্বপূর্ণ নাম ছিলো রামজি কালসাংরা—যিনি হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের কর্মী এবং প্রজ্ঞার মোটরবাইক ব্যবহারের বিষয়ে মূল সাক্ষী ছিলেন। পুলিশি জেরার পর তিনি নিখোঁজ হয়ে যান। কোনো স্পষ্ট তদন্ত হয়নি তার ‘হারিয়ে যাওয়া’ প্রসঙ্গে।
অপরদিকে, আরেক হিন্দু সাধু অসীমানন্দ কারাবন্দি অবস্থায় স্বীকার করেছিলেন, হায়দরাবাদের মক্কা মসজিদে বিস্ফোরণসহ একাধিক হামলার পেছনে হিন্দুত্ববাদীদের সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক জড়িত। তিনি আরও বলেন, কিছু নির্দোষ মুসলমানকে এই ঘটনায় মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।
মুসলমানদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের চিত্র
২০০০ সালের পর ভারতের মাটিতে যত সন্ত্রাসবাদী হামলা হয়েছে, প্রায় সব ক্ষেত্রেই মুসলমানদের অভিযুক্ত করা হয়েছে। হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণে জানা যায়—গত ১৫ বছরে এই ধরনের মামলায় নির্দোষ প্রমাণিত হওয়া মুসলমান আসামীদের হার ৯৮ শতাংশের বেশি। ১৮ বছর জেলে থাকার পর সম্প্রতি মুম্বাইয়ের ট্রেন বিস্ফোরণ মামলায় নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন ১২ জন মুসলমান।
এই পরিসংখ্যান শুধু বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা নয়, বরং রাষ্ট্রীয়ভাবে মুসলিমদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়নের এক দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রকল্পকেই নগ্নভাবে উন্মোচিত করে।
বাংলাদেশি ‘জঙ্গি’ তত্ত্ব—আসলে এক ষড়যন্ত্র?
ভারতের বিভিন্ন সন্ত্রাসবাদী ঘটনায় বহুবার বাংলাদেশি ইসলামপন্থীদের এবং রোহিঙ্গাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—আজ অবধি কোনো মামলায় কোর্টে একটিও বাংলাদেশি নাগরিক সন্ত্রাসের অভিযোগে দোষী প্রমাণিত হয়নি।
তাহলে হামলাগুলো কারা করেছিল?
এই প্রশ্ন আজ ভারতের সমাজ, রাজনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। মুসলমানদের যদি কোর্ট নির্দোষ ঘোষণা করে, তবে প্রকৃত সন্ত্রাসীরা কে? কে বা কারা এসব হামলার নেপথ্যে ছিলো, কেন কোনো বিকল্প তদন্ত হয়নি?
এখানে স্পষ্ট এক জিনিস ফুটে ওঠে—ভারতে বিজেপি সরকারের অধীনে হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসবাদকে চিহ্নিত করা যেমন কঠিন, তেমনি এসব নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াও প্রায় অসম্ভব।
উপসংহার: ন্যায়বিচারের মৃত্যুঘণ্টা?
ভারতের বর্তমান বাস্তবতায় যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে, তাকে শুধুমাত্র বিচারহীনতা বলে বর্ণনা করলেই যথেষ্ট নয়—এ এক রাষ্ট্রীয় বৈধতা প্রাপ্ত সাংগঠনিক সন্ত্রাসের নিখুঁত চিত্র। মুসলমানদের টার্গেট করে নির্মিত ‘সন্ত্রাসবাদী’ বয়ান, দোষারোপের রাজনীতি এবং হিন্দুত্ববাদীদের বেকসুর খালাস—এই পুরো ঘটনাক্রম একটি রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের অভিযোগকে আরো জোরালো করে তোলে।
একবিংশ শতাব্দীর ভারত হয়তো অর্থনৈতিকভাবে এগিয়েছে, কিন্তু ন্যায়বিচার ও সমতার প্রশ্নে সে ভয়াবহভাবে পিছিয়ে পড়েছে।