প্রক্রিয়াকরণ শেষে নিয়ম মেনে কার্যক্রম সম্পন্নের দাবি; সন্ধ্যায় অনলাইন প্রতিবেদন প্রকাশ, অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান
বিশেষ প্রতিবেদন | দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ
বেনাপোল (যশোর): যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দরে আমদানি করা ফ্রেশ মালটার চালানে ঘোষণার অতিরিক্ত কমলা পাওয়া এবং পরবর্তী সময়ে তা আটক ও নিলাম-সংক্রান্ত ঘটনাকে কেন্দ্র করে বেনাপোল কাস্টমসের বিরুদ্ধে অনলাইন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের একাংশের অভিযোগ, দাপ্তরিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরও ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে কাস্টমসের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে নেতিবাচক প্রচার চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে, সংশ্লিষ্ট কর্মস্থলে পোস্টিং নেই বলে দাবি করা মাহিদুলের নাম এ ঘটনায় জড়িয়ে দেওয়ায় অভিযোগের ভিত্তি ও তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে মাহিদুলের বর্তমান কর্মস্থল, সংশ্লিষ্ট সময়ে তাঁর দায়িত্ব এবং ঘটনায় তাঁর ভূমিকা সম্পর্কে দাপ্তরিক নথি যাচাই না করে তাঁকে ষড়যন্ত্রের শিকার কিংবা কোনো অনিয়মে জড়িত—কোনোটিই নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। একইভাবে, কোনো সংবাদকে প্রমাণ ছাড়া পরিকল্পিত অপপ্রচার বা ষড়যন্ত্র বলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়।
প্রক্রিয়াকরণ শেষে প্রতিবেদন প্রকাশ, সময়ক্রম নিয়ে প্রশ্ন
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গাজী ফ্রুটস অ্যান্ড ভেজিটেবল নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ভারত থেকে আমদানি করা ফ্রেশ মালটার চালান ঘিরে ঘটনাটি সামনে আসে। সংশ্লিষ্ট চালানের কাস্টমস প্রক্রিয়াকরণ ও প্রাথমিক পরীক্ষণ ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে ঘোষণার অতিরিক্ত প্রায় ২০০ ক্যারেট কমলা পাওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসে। ২৯ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টায় আটক পণ্য নিলামের তথ্যও সামনে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য, প্রক্রিয়াকরণসহ দাপ্তরিক কার্যক্রম নিয়ম অনুযায়ী সম্পন্ন করা হয়েছে। তাঁদের প্রশ্ন, যদি কোনো অনিয়মের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকে, তাহলে তা সংশ্লিষ্ট নথি ও তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশ করা উচিত। কিন্তু কোনো কর্মকর্তার ভূমিকা যাচাই না করে তাঁর নাম প্রতিবেদনে যুক্ত করা হলে তা তাঁর পেশাগত সুনাম ও ব্যক্তিগত মর্যাদার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে, কাস্টমসের কার্যক্রম নিয়ে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রশ্ন থাকলে সংবাদমাধ্যমের তা অনুসন্ধান ও প্রকাশ করার অধিকার রয়েছে। সে ক্ষেত্রে প্রতিবেদনে ব্যবহৃত তথ্যের উৎস, দাপ্তরিক নথি, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য এবং অভিযোগের প্রমাণের ভিত্তি স্পষ্ট করা জরুরি।
মাহিদুলের পোস্টিং নিয়ে প্রশ্ন, নথি যাচাইয়ের দাবি
ঘটনাটিতে মাহিদুলের নাম অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে। দাবি করা হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট সময়ে তাঁর ওই কর্মস্থলে পোস্টিং ছিল না। এ দাবি সত্য হলে, কোন তথ্যের ভিত্তিতে তাঁকে ঘটনাটির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদক ও প্রকাশনা কর্তৃপক্ষের কাছে পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে মাহিদুলের পোস্টিং আদেশ, বদলির নথি, সংশ্লিষ্ট সময়ের দায়িত্ব বণ্টন, উপস্থিতির রেকর্ড এবং ঘটনার সঙ্গে তাঁর কোনো দাপ্তরিক সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না—এসব তথ্য যাচাই করা দরকার। শুধু নাম উল্লেখের ভিত্তিতে ষড়যন্ত্রের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যেমন ঠিক নয়, তেমনি দাপ্তরিক নথি যাচাই ছাড়া কাউকে অভিযোগমুক্ত বলাও যথাযথ হবে না।
আনসার সদস্যদের দায়িত্ব নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করা জরুরি
ঘটনাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পণ্য আটক এবং আটক-পরবর্তী পাহারার দায়িত্বের পার্থক্য। সংশ্লিষ্ট সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তার এবং স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, কাস্টমস পণ্য আটক করার পর পাহারার দায়িত্ব আনসার সদস্যদের দেওয়া হয়েছিল। সে ক্ষেত্রে পণ্য পাহারা দেওয়া এবং পণ্য আটকের সিদ্ধান্ত গ্রহণ—দুটি পৃথক দায়িত্ব।
তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত অবস্থান নির্ধারণের জন্য আনুষ্ঠানিক আটকাদেশ, জব্দতালিকা, পণ্য হস্তান্তরের রেজিস্টার, আনসার বাহিনীর ডিউটি রোস্টার এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন। কোনো পক্ষের বক্তব্যকেই একমাত্র প্রমাণ হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
অনলাইন প্রতিবেদনের অভিযোগ যাচাইয়ের আহ্বান
কাস্টমসের বিরুদ্ধে অনলাইন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্টদের একাংশ ধারাবাহিক নেতিবাচক প্রচারের অভিযোগ তুলেছেন। তাঁদের বক্তব্য, সংবাদ প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য নেওয়া, দাপ্তরিক নথি যাচাই এবং অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা উচিত।
তবে কোনো প্রতিবেদনকে ‘অপপ্রচার’ হিসেবে চিহ্নিত করার আগে সেটিতে প্রকাশিত তথ্যের সত্যতা, ব্যবহৃত নথি, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য এবং প্রতিবেদকের অনুসন্ধানপ্রক্রিয়া পর্যালোচনা করা জরুরি। সংবাদে ভুল তথ্য বা অসম্পূর্ণ তথ্য থাকলে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের কাছে প্রতিবাদ, ব্যাখ্যা বা সংশোধনের আবেদন জানানো যেতে পারে।
যে নথিগুলো যাচাই করা জরুরি
ঘটনার প্রকৃত চিত্র পরিষ্কার করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নিম্নলিখিত নথি যাচাইয়ের দাবি উঠেছে—
১. ২৭ সেপ্টেম্বরের কাস্টমস প্রসেসিং, অ্যাসেসমেন্ট ও পরীক্ষণ প্রতিবেদন।
২. সংশ্লিষ্ট বিল অব এন্ট্রি, মেনিফেস্ট, ইনভয়েস ও প্যাকিং লিস্ট।
৩. অতিরিক্ত কমলা আটকের আনুষ্ঠানিক আদেশ ও জব্দতালিকা।
৪. পণ্য হেফাজত ও হস্তান্তরসংক্রান্ত রেজিস্টার।
৫. সংশ্লিষ্ট সময়ের আনসার বাহিনীর ডিউটি রোস্টার ও লগবুক।
৬. আফতারুল ইসলাম ও মাহিদুলের দায়িত্ব বণ্টন, পোস্টিং ও উপস্থিতির নথি।
৭. ২৯ সেপ্টেম্বরের নিলাম বিজ্ঞপ্তি, কার্যবিবরণী, বিক্রয়মূল্য এবং সরকারি কোষাগারে অর্থ জমার রসিদ।
৮. সংশ্লিষ্ট অনলাইন প্রতিবেদনে ব্যবহৃত তথ্যের উৎস ও বক্তব্য গ্রহণের রেকর্ড।
দোষারোপ নয়, তথ্যভিত্তিক তদন্তই হোক মূল লক্ষ্য
বেনাপোল স্থলবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রে রাজস্ব সুরক্ষা, দাপ্তরিক স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে অভিযোগের ভিত্তি যাচাই না করে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর নাম জড়িয়ে দেওয়া হলে তাঁর ন্যায্য অধিকার ও পেশাগত সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তাই মাহিদুলের পোস্টিং ও দায়িত্বসংক্রান্ত তথ্য, পণ্য আটকের প্রকৃত সময়ক্রম, কাস্টমসের প্রক্রিয়াকরণ এবং নিলামসংক্রান্ত নথি নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। অনলাইন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্য থাকলে তা প্রমাণসহ সংশোধন করা উচিত। আর অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পদমর্যাদা বা পরিচয় বিবেচনা না করে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াই হবে জবাবদিহিমূলক প্রশাসনের পরিচয়।