নিজস্ব প্রতিবেদক | বেনাপোল
তারিখ: ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বেনাপোল: যশোরের বেনাপোল পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ভবেরবেড় এলাকায় মাদক ব্যবসা, কথিত মাদক নেটওয়ার্ক ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ নিয়ে স্থানীয়দের উদ্বেগ নতুন করে সামনে এসেছে। গত ৩ জুলাই এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পরও অভিযোগের বাস্তবতায় দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়নি বলে দাবি স্থানীয়দের। এরই মধ্যে সীমান্ত এলাকায় মাদক কারবারের অভিযোগে আলামিন নামের এক ব্যক্তিকে ঘিরেও স্থানীয় পর্যায়ে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, ভবেরবেড় এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক বেচাকেনা ও সরবরাহের নানা অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রেহানা বেগম ও তার পরিবারের কয়েকজন সদস্যের নাম উঠে এসেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সিপন, ইরশাদ নয়ন, সাদ্দাম ও ঝর্ণা নামের কয়েকজনের বিরুদ্ধেও মাদক সংক্রান্ত অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে—এমন কোনো সিদ্ধান্তও এই প্রতিবেদনে দেওয়া হচ্ছে না। বরং স্থানীয়দের অভিযোগ এবং জননিরাপত্তার স্বার্থে বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
ভবেরবেড় এলাকায় মাদক নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ
স্থানীয়দের দাবি, ভবেরবেড় এলাকায় ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন ও নেশাজাতীয় সিরাপসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্যের বেচাকেনা ও সরবরাহ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি ও পরিবারের মাধ্যমে এলাকায় একটি কথিত নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে। একটি বাড়িকে ঘিরেও মাদক সংরক্ষণ ও সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি তাদের।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সাম্প্রতিক কোনো মামলা, আদালতের নথি কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এই প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত অপরিহার্য।
রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রাজনৈতিক পরিচয়। এলাকাবাসীর একটি অংশের দাবি, অতীতে পরিবারের কয়েকজন সদস্য আওয়ামী লীগের স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার পরিচয় ব্যবহার করে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করেছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, অতীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি ও সভায় তাদের বাড়িতে লোকজনের সমাগম হয়েছে। এ কারণে রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব ব্যবহার করে বিভিন্ন অভিযোগ আড়াল করা হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নও তুলছেন কেউ কেউ।
তবে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা থাকা নিজেই অপরাধের প্রমাণ নয়। মাদক ব্যবসার অভিযোগের সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয়ের কোনো বাস্তব যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হওয়া প্রয়োজন।
ক্ষমতার পরিবর্তনের পরও অভিযোগ কেন?
রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পরিবর্তন এলেও ভবেরবেড় এলাকায় মাদক সংক্রান্ত অভিযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে দাবি স্থানীয়দের।
তাদের প্রশ্ন, এলাকায় যদি সত্যিই মাদক বেচাকেনা বা সরবরাহের ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা তৎপরতা ও নজরদারির মধ্যেও তা কীভাবে অব্যাহত থাকতে পারে?
অন্যদিকে অভিযোগের কোনো ভিত্তি না থাকলে তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য প্রকাশ করা জরুরি বলেও মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
নতুন করে আলোচনায় আলামিন
এদিকে বেনাপোল সীমান্ত এলাকায় মাদক কারবারের অভিযোগকে কেন্দ্র করে আলামিন নামের এক ব্যক্তির নামও স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনায় এসেছে।
স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, মাদক সরবরাহ ও বেচাকেনার সঙ্গে আলামিনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকার সুযোগ ব্যবহার করে কোনো মাদকচক্র সক্রিয় রয়েছে কি না এবং তার সঙ্গে আলামিনের কোনো সম্পর্ক আছে কি না—তা তদন্ত করে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
তবে আলামিনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তিনি কোনো মাদক মামলায় অভিযুক্ত, গ্রেপ্তার বা দণ্ডিত হয়েছেন কি না—এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট থানার নথি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রয়োজন।
মাদকের পাশাপাশি চোরাচালানের অভিযোগ
বেনাপোল আন্তর্জাতিক সীমান্ত ও স্থলবন্দর এলাকা হওয়ায় স্থানীয় অভিযোগের সঙ্গে চোরাচালানের বিষয়টিও উঠে এসেছে।
স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, সীমান্তকে ব্যবহার করে মাদকসহ বিভিন্ন অবৈধ পণ্য পাচারের চেষ্টা হয়ে থাকতে পারে। তবে কথিত কোনো নেটওয়ার্ক বাস্তবে সক্রিয় কি না কিংবা কারা এর সঙ্গে জড়িত—তা তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
তরুণ সমাজ নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা
স্থানীয়দের মতে, মাদক সহজলভ্য হয়ে থাকলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বে তরুণ প্রজন্ম। তাই শুধু অভিযান নয়, নিয়মিত গোয়েন্দা নজরদারি, জনসচেতনতা ও সামাজিক প্রতিরোধও জরুরি।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “আমরা চাই প্রশাসন কাউকে রাজনৈতিক বা পারিবারিক পরিচয়ে দেখুক না। যার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, তদন্ত করে সত্য বের করা হোক। সত্য হলে ব্যবস্থা নেওয়া হোক, আর অভিযোগ মিথ্যা হলে সেটিও পরিষ্কার করা হোক।”
পুলিশের কঠোর অবস্থান—বেনাপোলে অপরাধীদের জন্য ছাড় নেই
বেনাপোলের মতো আন্তর্জাতিক সীমান্ত নগরীতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের কঠোর অবস্থানের কথা উঠে এসেছে বেনাপোল পোর্ট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ আশরাফ হোসেনের বক্তব্যে।
তিনি বলেন, “বেনাপোল একটি আন্তর্জাতিক গুরুত্বসম্পন্ন সীমান্ত নগরী। প্রতিদিন এখানে হাজার হাজার দেশি-বিদেশি যাত্রী ও শত শত পণ্যবাহী ট্রাক যাতায়াত করে। এখানে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি কিংবা অস্ত্রধারীদের কোনো স্থান নেই। ধৃত আসামির বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে নতুন একটি মামলা দায়ের করে বিচারিক প্রক্রিয়ায় আদালতে সোপর্দ করা হচ্ছে। কোনো অপরাধী যত কৌশলীই হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় আসতে হবে।”
ওসির এই বক্তব্যে অপরাধীদের বিরুদ্ধে পুলিশের ‘জিরো টলারেন্স’ অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। সীমান্তনগরীর নিরাপত্তা, বন্দরকেন্দ্রিক স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এমন কঠোর অবস্থানকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন স্থানীয়রা।
বিশেষ করে অপরাধী যত প্রভাবশালী বা কৌশলীই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনার যে বার্তা পুলিশ দিয়েছে—তা বেনাপোলের সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাড়ানো হয়েছে নজরদারি, সক্রিয় টহল
পুলিশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে সীমান্ত এলাকার সন্দেহভাজন পয়েন্ট, কথিত আস্তানা ও চোরাচালানের সম্ভাব্য রুটে সাদা পোশাকে নজরদারি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
একই সঙ্গে বন্দর এলাকা, মহাসড়ক, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও বিভিন্ন সংযোগ এলাকায় মোবাইল টহল এবং বাইক স্কোয়াড সক্রিয় রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অপরাধ সংক্রান্ত সঠিক তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করা ব্যক্তিদের পরিচয় গোপন রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অস্ত্রসহ গ্রেপ্তারে স্বস্তি, মাদকেও চান দৃশ্যমান অভিযান
সম্প্রতি অস্ত্র ও গুলিসহ একজন আসামি গ্রেপ্তার এবং তার বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা দায়েরের ঘটনায় স্থানীয় ব্যবসায়ী, পথচারী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
তবে তাদের প্রত্যাশা, অস্ত্রের পাশাপাশি মাদক, চোরাচালান, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির অভিযোগের ক্ষেত্রেও নিয়মিত, দৃশ্যমান ও নিরপেক্ষ অভিযান পরিচালনা করা হবে।
পুলিশ সুপারের মাদকবিরোধী অবস্থানের পরও স্থানীয়দের প্রশ্ন
যশোর জেলার পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম, পিপিএম মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে অভিযান ও নজরদারির নির্দেশনা দিয়ে থাকেন—এমন প্রেক্ষাপটে ভবেরবেড়ের অভিযোগগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করার দাবি স্থানীয় সচেতন মহলের।
তাদের প্রশ্ন—অভিযোগ সত্য হলে কারা এর সঙ্গে জড়িত, কীভাবে মাদক সরবরাহ হচ্ছে এবং কোথা থেকে আসছে; আর অভিযোগ সত্য না হলে কারা কেন এমন অভিযোগ ছড়াচ্ছে—দুই ক্ষেত্রেই প্রকৃত সত্য উদঘাটন জরুরি।
প্রশাসনের কাছে স্থানীয়দের দাবি
ভবেরবেড় ৬ নম্বর ওয়ার্ডে মাদক সংক্রান্ত অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা।
রেহানা পরিবার, আলামিনসহ যাদের নাম স্থানীয় অভিযোগে উঠে এসেছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য বা প্রমাণ রয়েছে কি না তা যাচাই করা।
মাদক ব্যবসার সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক, সামাজিক বা প্রভাবশালী মহলের যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা।
অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া।
অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য প্রকাশ করে নির্দোষ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সৃষ্ট বিভ্রান্তি দূর করা।
শেষ প্রশ্ন—‘জিরো টলারেন্স’ কতটা কার্যকর হবে?
বেনাপোল বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত ও স্থলবন্দর এলাকা। ফলে মাদক ও চোরাচালানের মতো অপরাধের অভিযোগকে কোনোভাবেই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।
৩ জুলাইয়ের প্রতিবেদনের পরও স্থানীয়দের কাছ থেকে একই ধরনের অভিযোগ অব্যাহত থাকার দাবি নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। তবে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থার।
পুলিশের পক্ষ থেকে যখন স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে—“কোনো অপরাধী যত কৌশলীই হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় আসতে হবে”—তখন স্থানীয়দের প্রত্যাশা, ভবেরবেড়সহ পুরো বেনাপোল এলাকায় মাদক, চোরাচালান ও অন্যান্য অপরাধের বিরুদ্ধে এই কঠোর অবস্থানের বাস্তব প্রয়োগও দৃশ্যমান হবে।
অভিযোগ সত্য হলে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং অভিযোগ মিথ্যা হলে প্রকৃত সত্য উদঘাটন—দুই ক্ষেত্রেই নিরপেক্ষ তদন্তই হতে পারে জনআস্থা তৈরির সবচেয়ে কার্যকর পথ।
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ