“বাংলাদেশ এক সন্ধিক্ষণে: সেনাবাহিনীকে নিয়ে মিথ্যাচার রাষ্ট্রের জন্য অকল্যাণকর — জুলকারনাইন সাইর”
প্রতিবেদক: বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ ডেস্ক রিপোর্ট :
বাংলাদেশ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে—এমন মন্তব্য করেছেন আল-জাজিরার সাংবাদিক জুলকারনাইন সাইর। দীর্ঘদিন পর তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীকে ঘিরে একটি বিস্তৃত পোস্টে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, সামাজিক বিভ্রান্তি এবং সেনাবাহিনীর অবদান নিয়ে কঠোর বিশ্লেষণ করেছেন।
সংকটের চিত্র
জুলকারনাইন সাইরের মতে, জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে দেশ গভীর হতাশায় নিমজ্জিত। সীমিত জ্ঞান, সীমাহীন ইন্টারনেটের অপপ্রয়োগ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার জটিল মিশ্রণ সমাজকে সংকটময় অবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে। আওয়ামী লীগের স্বৈরতন্ত্র ভেঙে পড়লেও কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়নি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিথ্যা প্রচার এখন নতুন এক “শিল্পে” পরিণত হয়েছে, যেখানে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীও রেহাই পাচ্ছে না।
সেনাবাহিনীর অবদান
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ১ আগস্ট ২০২৪ থেকে সেনাবাহিনীর অধিকাংশ কর্মকর্তা জনগণের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে স্বৈরতন্ত্র থেকে দেশকে মুক্ত করতে ভূমিকা রেখেছিলেন। জীবন ঝুঁকি নিয়ে শতশত কর্মকর্তা তথ্য সরবরাহ করেছিলেন, কেউই প্রতিদান দাবি করেননি। “আয়নাঘর” সম্পর্কিত গোপন তথ্য প্রকাশ কিংবা গুম-খুনের বিরোধিতায় সামরিক সদস্যদের অবদানকে তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন।
৪-৫ আগস্টের সংকটকালে দুই মেজর জেনারেল ও কয়েকজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সেনা অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা প্রতিহত করেন, স্বৈরাচার সরকারের ঘনিষ্ঠদের গ্রেফতারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। একাধিক ব্রিগেডিয়ারকে তিনি বিশেষভাবে প্রশংসা করেছেন, যারা জনগণের দিকে গুলি চালানোর নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন বা পরবর্তীতে বাহিনীর ভেতরে ফ্যাসিবাদী প্রভাব মোকাবিলায় নীরবে কাজ করেছেন।
অপপ্রচার ও মিথ্যাচার
জুলকারনাইন সাইর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আজ সেই দেশপ্রেমিক অফিসারদের নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে নানারকম কুৎসা রটানো হচ্ছে। কাউকে “র”-এর এজেন্ট, কাউকে ফ্যাসিবাদী দোসর বানানো হচ্ছে। তিনি ব্যঙ্গ করে লিখেছেন, “বাংলাদেশে যত RAW এজেন্ট বানানো হয়েছে, সম্ভবত ভারতের RAW প্রধান নিজেও জানেন না তাঁর অধীনে আসলেই এত এজেন্ট আছেন কিনা।”
সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবতা
সাইর মনে করেন, সেনাবাহিনী মাঠে থাকলেও সন্ত্রাস কমছে না কারণ তাদেরও সীমাবদ্ধতা আছে। সেনারা জীবন হুমকির মুখে পড়লেই অস্ত্র ব্যবহার করেন। তিনি সাম্প্রতিক সময়ে ছিনতাইকারীদের হাতে সেনা সদস্য আহত হওয়া এবং সুব্রত বাইন-মোল্লা মাসুদ গ্রেফতারের পর সংশ্লিষ্ট অফিসারদের সামাজিক হয়রানির প্রসঙ্গ টেনে বলেন—এসব মনোবল ভাঙার কৌশল।
ভেতরের চ্যালেঞ্জ
তিনি সতর্ক করেন, সেনাবাহিনীর ভেতরে রাজনৈতিক বিভক্তি রয়ে গেলে সামনে “অমানিশার অন্ধকার” ছাড়া আলো দেখা যাবে না। অবসরপ্রাপ্ত বা রাজনৈতিক কারণে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো কর্মকর্তাদের বিষয়ে বাহিনীকে আরও নমনীয় হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। একইসাথে গুম-খুনে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান বজায় রাখার কথা বলেন।
প্রতিবেদনের এক পর্যায়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন:
“ভ্রান্ত প্রচারণা ও মিথ্যাচারের মাধ্যমে দেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সূর্য যেমন পূর্বদিকে ওঠে, তেমনি বাংলাদেশের জনগণও যে কোনো সংকটে সেনাবাহিনীর কাছেই আশ্রয় খুঁজবে।”
আল-জাজিরার সাংবাদিক জুলকারনাইন সাইরের এই পোস্টটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক-সামাজিক অস্থিরতা ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থার বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।