নাহিদ গ্রুপের আড়ালে 'মাফিয়া সিন্ডিকেট'—তন্ময় ও কিতাব আলীর সাম্রাজ্য
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
একটি কর্পোরেট হাউজের প্রভাব খাটিয়ে পর্দার আড়ালে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী মাফিয়া সিন্ডিকেট। নাহিদ গ্রুপের নাম ব্যবহার করে এই চক্রটি নিয়ন্ত্রণ করছে স্থানীয় রাজনীতি, প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা। এই সিন্ডিকেটের মূল অপারেশনাল হেড হিসেবে উঠে এসেছে তন্ময় দাস ও কিতাব আলীর নাম। ঝন্টু কুমার সাহার আড়ালে থেকে এই দুজন গড়ে তুলেছেন এক ত্রাসের রাজত্ব, যেখানে আছে বিপুল অবৈধ সম্পদ এবং ডজন ডজন মিথ্যা মামলা।
১. কিতাব আলী: সিন্ডিকেটের 'ম্যানেজমেন্ট মাস্টার' ও মধ্যস্থতাকারী
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা কিতাব আলী বর্তমানে আনোয়ার হোসেনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। একটি ভ্যাট সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করলেও, তার প্রকৃত কাজ হলো সিন্ডিকেটের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
বিলাসবহুল জীবন ও নৈতিক অবক্ষয়: কিতাব আলীর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ও নৈতিক চারিত্রিক স্খলনের গুরুতর প্রমাণ পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, কর্মস্থলের সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে তিনি নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতেন, যার সচিত্র প্রমাণ (ছবি ও ভিডিও) বর্তমানে বিভিন্ন মহলে ছড়িয়ে পড়েছে।
রাজনৈতিক লবিং ও 'টাকা পৌঁছানোর মাস্টার': রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলে অর্থ পৌঁছে দেওয়া এবং ঝন্টু কুমার সাহার অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার ক্ষেত্রে কিতাব আলী প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেন। আর্থিক অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তা পেশিশক্তি ও টাকার বিনিময়ে মীমাংসা করাই তার প্রধান কাজ।
২. তন্ময় দাস: ৩৫ বছর বয়সেই শতকোটির মালিক?
সিন্ডিকেটের সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং ঝন্টু কুমার সাহার 'ডান হাত' হিসেবে পরিচিত তন্ময় দাস। তার উত্থান ও সম্পদের পাহাড় দেখে স্থানীয় মানুষ হতবাক।
অস্বাভাবিক সম্পদ: মাত্র ৩৫ বছর বয়সে তন্ময় দাসের সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে বলে স্থানীয়দের দাবি। একজন সাধারণ পেশাজীবী হিসেবে এত অল্প সময়ে এই পরিমাণ সম্পদ অর্জন করা কার্যত অসম্ভব। অভিযোগ রয়েছে, নাহিদ গ্রুপের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি এবং ঝন্টু কুমারের কালো টাকা সাদা করার মাধ্যমেই এই সম্পদের পাহাড় গড়া হয়েছে।
কালো টাকার কারিগর: ঝন্টু কুমার সাহার যত অনৈতিক যোগাযোগ এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের হিসাব-নিকাশ, তার সবই পরিচালিত হয় তন্ময় দাসের মাধ্যমে।
৩. মামলা বাণিজ্যের ব্লু-প্রিন্ট: কণ্ঠরোধের অস্ত্র
এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুললেই তাকে দমিয়ে দেওয়া হয় 'মামলা বাণিজ্যের' মাধ্যমে। এই কাজে তন্ময় দাসকে প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
সিরিয়াল মামলা: সিন্ডিকেটের অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় ৫-৬ জন ব্যক্তিকে টার্গেট করা হয়েছে। তন্ময় দাসকে বাদী সাজিয়ে বিভিন্ন থানায় এই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রায় ১৪ থেকে ১৫টি হয়রানিমূলক মামলা করা হয়েছে।
পরিকল্পিত হয়রানি: এই মামলাগুলোর পেছনে মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে ঝন্টু কুমার সাহা এবং কিতাব আলীর সরাসরি ইন্ধন রয়েছে। এটি একটি কৌশল যাতে সাধারণ মানুষ ভয়ে এই মাফিয়া চক্রের বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস না পায়।
৪. অনুসন্ধানে উঠে আসা চাঞ্চল্যকর তথ্যসমূহ
বিষয় বিবরণ
মূল হোতা ঝন্টু কুমার সাহা
অপারেশনাল প্রধান তন্ময় দাস ও কিতাব আলী
অভিযোগের ধরন আর্থিক অনিয়ম, নৈতিক অবক্ষয়, ভ্যাট ফাঁকি ও চাঁদাবাজি
মামলা সংখ্যা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অন্তত ১৫টি সাজানো মামলা
অবৈধ সম্পদ তন্ময় দাসের নামে প্রায় ৫০ কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ
৫. জনমনে ক্ষোভ ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপের দাবি
সচেতন নাগরিক সমাজ ও ভুক্তভোগীরা এখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার অবস্থায় রয়েছেন। তাদের দাবি, এই সিন্ডিকেট কেবল একটি কোম্পানিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং রাষ্ট্রীয় আইনের শাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে।
নাগরিক সমাজের দাবি:
দুদক (ACC) তদন্ত: তন্ময় দাসের ৫০ কোটি টাকার সম্পদের উৎস দ্রুত তদন্ত করতে হবে।
কিতাব আলীর অপসারণ: অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত কিতাব আলীকে প্রভাবশালী পদ থেকে সরিয়ে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
মামলা প্রত্যাহার: উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং সাজানো মামলাগুলো নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রত্যাহার করতে হবে।
"সত্য কোনোদিন চাপা থাকে না। আজ হোক বা কাল, ঝন্টু কুমার সাহা, তন্ময় এবং কিতাব আলীর এই অন্ধকার রাজত্বের বিচার বাংলার মাটিতে হবেই।" — একজন ভুক্তভোগীর মন্তব্য।
উপসংহার: নাহিদ গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠানের ইমেজ রক্ষা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিতে এই ‘মাফিয়া সিন্ডিকেট’ ভেঙে দেওয়া সময়ের দাবি। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও দুর্নীতি দমন কমিশনের কঠোর পদক্ষেপই পারে এই অশুভ চক্রের অবসান ঘটাতে।