নরসিংদীর শিবপুরে পৃথক অভিযানে মাদকদ্রব্যসহ ইমন গ্রেপ্তার, ডাকাতি মামলায় সাইফুল আটক
প্রাইভেটকার থেকে ১৯৮ বোতল কাশির সিরাপ উদ্ধারের দাবি পুলিশের, ডাকাতি মামলায় সাইফুলের ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন
আবু নাঈম রিপন, নরসিংদী প্রতিনিধি
নরসিংদীর শিবপুর উপজেলায় পৃথক দুটি পুলিশি অভিযানে মাদকদ্রব্য উদ্ধারের ঘটনায় ইমন মিয়া (২৬) নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই রাতে আন্তজেলা ডাকাত দলের সদস্য বলে পুলিশের দাবি করা সাইফুল গাজী (৩১) নামে আরেক ব্যক্তিকেও আটক করা হয়েছে। মাদক উদ্ধারের ঘটনায় একটি প্রাইভেটকার জব্দ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। অন্যদিকে, ডাকাতি মামলার তদন্তের স্বার্থে সাইফুলকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করেছে পুলিশ।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৯ অক্টোবর শুক্রবার রাত আনুমানিক ১০টা ১০ মিনিটে শিবপুর উপজেলার ইটাখোলায় ঢাকা–সিলেট মহাসড়কের শাষপুর শহীদ মিনারসংলগ্ন সড়কে অভিযান চালানো হয়। শিবপুর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ কোহিনুর মিয়ার নির্দেশনায় উপপরিদর্শক (এসআই) কাইয়ূমের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সেখানে অভিযান পরিচালনা করে। এ সময় ঢাকা মেট্রো-২৭-৮০৫১ নম্বরের একটি পুরোনো রুপালি রঙের টয়োটা প্রাইভেটকারসহ ইমন মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। অভিযানের সময় অন্যরা পালিয়ে যায় বলেও পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।

প্রাইভেটকার থেকে ১৯৮ বোতল সিরাপ উদ্ধারের দাবি
পুলিশের দেওয়া প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ইমন মিয়ার ব্যবহৃত প্রাইভেটকারের পেছনের ডালায় থাকা একটি ব্যাগে রাখা বস্তা থেকে ১৪৮ বোতল এসকাফ কাশির সিরাপ এবং ৫০ বোতল হাইড্রোক্লোরাইড সিরাপ উদ্ধার করা হয়েছে। সব মিলিয়ে উদ্ধার করা বোতলের সংখ্যা ১৯৮। উদ্ধার করা সিরাপের আনুমানিক বাজারমূল্য ৫ লাখ ৯৪ হাজার টাকা বলে পুলিশ উল্লেখ করেছে।
পুলিশের ভাষ্য, জিজ্ঞাসাবাদে ইমন মিয়া গাড়িতে থাকা সিরাপের বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে তাঁর কোনো লিখিত জবানবন্দি, স্বীকারোক্তি কিংবা আদালতে দেওয়া বক্তব্য রয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তাই জিজ্ঞাসাবাদসংক্রান্ত তথ্যকে পুলিশের বক্তব্য হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন।
পুলিশের দাবি, একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের মাদকদ্রব্যের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। তবে চক্রটির অন্য সদস্য কারা, মাদকদ্রব্যের উৎস কোথায়, কোথায় সরবরাহ করা হতো এবং এর সঙ্গে আর কারা জড়িত—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। কেবল একজনের গ্রেপ্তার বা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের তথ্যের ভিত্তিতে অন্য কারও অপরাধে সম্পৃক্ততা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা যায় না।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে ব্যবস্থা
প্রাপ্ত তথ্যে বলা হয়েছে, এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৩৬(১) ধারার তফসিলের ১৪(গ) এবং ৩৮/৪১ ধারার উল্লেখ করে শিবপুর মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরির তথ্য দেওয়া হয়েছে। সেখানে জিডি নম্বর ৪৪২ এবং তারিখ ৯ অক্টোবর ২০২৬ উল্লেখ রয়েছে।
তবে মাদক উদ্ধারের ঘটনায় শুধু সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে, নাকি নিয়মিত মামলা দায়ের হয়েছে—এ বিষয়ে আরও নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট মামলার নম্বর, জব্দতালিকা, উদ্ধার করা সিরাপের রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদন এবং আদালতে পাঠানোর নথি পাওয়া গেলে ঘটনার আইনগত অবস্থান আরও স্পষ্ট হবে।
বিশেষজ্ঞ পরীক্ষায় উদ্ধার করা তরলের প্রকৃতি, উপাদান ও আইন অনুযায়ী তার শ্রেণিবিন্যাস নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে জব্দ করা বোতলের সংখ্যা, সেগুলোর লেবেল, উৎপাদন ও সরবরাহসংক্রান্ত তথ্য এবং পরিবহনের উদ্দেশ্য তদন্তে যাচাই করা প্রয়োজন। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই অভিযোগের আইনগত ভিত্তি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দায় নির্ধারণ করা সম্ভব।
পৃথক অভিযানে সাইফুল গাজী আটক
এদিকে একই রাতে রাত আনুমানিক ১১টা ৪৫ মিনিটে শিবপুর উপজেলার বড়ুইতলা এলাকায় যৌথবাহিনীর সহযোগিতায় সাইফুল গাজী (৩১) নামে আরেক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে প্রাপ্ত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। পুলিশ তাঁকে আন্তজেলা ডাকাত দলের সদস্য বলে দাবি করেছে। তবে এ পরিচয় ও অভিযোগের সত্যতা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া এবং তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাইফুলের বিরুদ্ধে শিবপুর মডেল থানার একটি ডাকাতি মামলার উল্লেখ রয়েছে। মামলার নম্বর হিসেবে জিআর ১৭৭/১৩/৯/২৬ এবং দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৩৯৪ ও ৩৯৭ ধারার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে মামলার নম্বর ও তারিখের বিন্যাসটি সংশ্লিষ্ট থানার নথি এবং আদালতের কাগজপত্র থেকে যাচাই করা প্রয়োজন।
দণ্ডবিধির ৩৯৪ ধারা ডাকাতি বা ছিনতাইয়ের সময় আঘাত করার মতো অপরাধের সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যদিকে, ৩৯৭ ধারায় ডাকাতি বা ছিনতাইয়ের সময় প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার কিংবা গুরুতর আঘাতের মতো নির্দিষ্ট পরিস্থিতির বিষয় রয়েছে। কোন ধারায় কী অভিযোগ আনা হয়েছে এবং সাইফুলের বিরুদ্ধে সেসব অভিযোগের সুনির্দিষ্ট ভিত্তি কী—তা মামলার এজাহার ও তদন্তের নথি পর্যালোচনা করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
সাত দিনের রিমান্ড আবেদন
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ডাকাতি মামলাসহ বিভিন্ন অপরাধের তথ্য সংগ্রহ এবং ঘটনার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত কি না, তা জানার জন্য সাইফুলকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। এ কারণে তাঁকে আদালতে পাঠিয়ে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে রিমান্ড আবেদন করা এবং আদালত কর্তৃক রিমান্ড মঞ্জুর করা এক বিষয় নয়। আদালত মামলার নথি, অভিযোগের ধরন, তদন্তের প্রয়োজনীয়তা এবং আইনগত শর্ত বিবেচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন। আদালতের আদেশ পাওয়া না পর্যন্ত রিমান্ড মঞ্জুর হয়েছে—এমন দাবি করা সঠিক হবে না।
তদন্তের প্রয়োজনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আইনগত অধিকার ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা বজায় রাখা জরুরি। অভিযোগের সত্যতা যাচাই, প্রাসঙ্গিক আলামত সংগ্রহ এবং সাক্ষীদের বক্তব্য গ্রহণের মাধ্যমে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অভিযান, প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্ত
শিবপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও জনবসতিপূর্ণ এলাকায় মাদকদ্রব্যের অবৈধ পরিবহন এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের অভিযোগ স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। এসব অভিযোগের কার্যকর তদন্ত এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব। একই সঙ্গে অভিযানের প্রতিটি ধাপ নথিভুক্ত করা, জব্দ করা আলামত যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা এবং তদন্তের তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে আদালতে উপস্থাপন করাও গুরুত্বপূর্ণ।
এ ঘটনায় প্রাইভেটকারের মালিকানা, গাড়িটি কে ব্যবহার করছিলেন, উদ্ধার করা সিরাপের উৎস, সম্ভাব্য সরবরাহব্যবস্থা এবং অন্য কেউ জড়িত কি না—এসব বিষয় তদন্তে যাচাই করা প্রয়োজন। একইভাবে সাইফুল গাজীর বিরুদ্ধে উল্লিখিত মামলার এজাহার, পূর্ববর্তী তদন্তের অগ্রগতি এবং গ্রেপ্তারের সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা জরুরি।
অভিযুক্তদের বক্তব্য ও পুলিশের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা প্রয়োজন
এ প্রতিবেদন তৈরির জন্য পাওয়া তথ্যে গ্রেপ্তার ইমন মিয়া ও সাইফুল গাজীর বক্তব্য, তাঁদের আইনজীবীর প্রতিক্রিয়া এবং তাঁদের পরিবারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। শিবপুর মডেল থানার পক্ষ থেকে উল্লিখিত তথ্যের বাইরে বিস্তারিত আনুষ্ঠানিক বক্তব্যও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে এবং মামলার নথি, জব্দতালিকা ও আদালতের আদেশ যাচাই করা হলে প্রতিবেদনটি প্রয়োজন অনুযায়ী হালনাগাদ করা হবে।
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ মনে করে, মাদক ও সংঘবদ্ধ অপরাধের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে আগেভাগে দোষী সাব্যস্ত না করে প্রমাণ, আইন ও আদালতের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিতে হবে। অপরাধের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির ন্যায়বিচারের অধিকার—দুটিই আইনের শাসনের অপরিহার্য অংশ।
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ-এর পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট পুলিশ প্রশাসন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের আইনজীবী ও পরিবারের বক্তব্য এবং মামলার নথি পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি সংশোধন বা হালনাগাদ করার সুযোগ রাখা হচ্ছে।
#নরসিংদী #শিবপুর #মাদকদ্রব্যউদ্ধার #ইমনমিয়া #সাইফুলগাজী #পুলিশিঅভিযান #ডাকাতিমামলা #মাদকবিরোধীঅভিযান #আইনেরশাসন #নিরপেক্ষতদন্ত #দৈনিকবাংলাদেশপ্রথমসংবাদ #জনতারকণ্ঠস্বর