ধুনটে বিএনপি নেতা ও সপরিবারে চাঁদাবাজি মামলা: পুলিশের ‘তালবাহানা’ ও গণবিক্ষোভে উত্তাল জনপদ
নাজমুল হাসান, ধুনট (বগুড়া) প্রতিনিধি
বগুড়ার ধুনট উপজেলায় এক সংবাদপত্রের বিক্রয়কর্মীর ওপর হামলা ও অর্থ ছিনতাইয়ের অভিযোগে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ভিপি আবুল মুনসুর আহমেদ পাশা, তার স্ত্রী ও পুত্রের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে মামলা হওয়ার ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করতে না পারায় এলাকায় চরম উত্তেজনা ও জনমনে ক্ষোভ বিরাজ করছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে পুলিশ আসামিদের গ্রেপ্তারে গড়িমসি করছে।
ঘটনার বিবরণ: পথরোধ ও অর্থ লুট
মামলার এজাহার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে উপজেলার উল্লাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা চপল মাহমুদ কাজ শেষে বাড়ি ফিরছিলেন। রাত আনুমানিক সময়ে হুকুমআলী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পৌঁছালে আসামিরা তার গতিরোধ করে।
অভিযোগ উঠেছে যে, উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ভিপি আবুল মুনসুর আহমেদ পাশা, তার স্ত্রী তথা উপজেলা মহিলা দলের সভাপতি শারমিন সুলতানা দীপ্তি এবং তাদের ছেলে নাফিস ফয়সাল আকাশ চপল মাহমুদের পথ আটকে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করেন। চপল চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে আসামিরা তাকে দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা দিয়ে এলোপাথাড়ি মারধর করে। একপর্যায়ে তার কাছে থাকা কোম্পানির সিগারেট বিক্রির ৪০ হাজার টাকা জোরপূর্বক ছিনিয়ে নিয়ে তারা পালিয়ে যায়। আহত চপল মাহমুদকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
জনরোষ ও মহাসড়ক অবরোধ
ঘটনার পর চপল মাহমুদের স্ত্রী নাছিমা খাতুন থানায় লিখিত অভিযোগ দিলেও পুলিশ তা রেকর্ড করতে ‘তালবাহানা’ করে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর প্রতিবাদে গত শনিবার দুপুরে ফুঁসে ওঠে এলাকাবাসী। হুকুমআলী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় শত শত মানুষ সড়ক অবরোধ করে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেন। দীর্ঘক্ষণ যানচলাচল বন্ধ থাকায় সাধারণ যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন। পরে ধুনট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ঘটনাস্থলে গিয়ে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলে জনতা অবরোধ তুলে নেয়। ওই রাতেই অভিযোগটি নিয়মিত মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়।
অভিযুক্তের পাল্টা দাবি
ঘটনা প্রসঙ্গে বিএনপি নেতা ভিপি আবুল মুনছুর আহম্মেদ পাশা বলেন, "এটি কোনো চাঁদাবাজি নয়। পূর্ব বিরোধের জেরে চপল মাহমুদের সঙ্গে আমার ছেলের হাতাহাতি হয়েছিল। চপল মাহমুদই প্রথমে আমার ছেলেকে মারধর করেছেন। আমাদের রাজনৈতিকভাবে হয়রানি ও সুনাম নষ্ট করতেই এই মিথ্যা মামলা সাজানো হয়েছে।"
আইনি বিশ্লেষণ: দোষী সাব্যস্ত হলে যে শাস্তির বিধান
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মামলার এজাহারে উল্লেখিত অভিযোগগুলো (চাঁদাবাজি, মারধর ও ছিনতাই) দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আসামিরা নিম্নোক্ত মেয়াদে শাস্তির মুখোমুখি হতে পারেন:
চাঁদাবাজি (দণ্ডবিধি ৩৮৪ ধারা): ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায় প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ৩ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
মারধর ও আঘাত (দণ্ডবিধি ৩২৩ ধারা): ইচ্ছাকৃত আঘাতের জন্য ১ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
ছিনতাই বা দস্যুতা (দণ্ডবিধি ৩৯২ ধারা): পথরোধ করে অর্থ ছিনিয়ে নেওয়া প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড হতে পারে। যেহেতু ঘটনাটি রাতে মহাসড়ক সংলগ্ন এলাকায় ঘটেছে, অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় শাস্তি ১৪ বছর পর্যন্ত বর্ধিত হতে পারে।
একনজরে মামলার প্রোফাইল
বিষয় বিবরণ
মূল আসামি ভিপি আবুল মুনসুর আহমেদ পাশা (সাধারণ সম্পাদক, ধুনট উপজেলা বিএনপি)
সহ-আসামি শারমিন সুলতানা দীপ্তি (স্ত্রী) ও নাফিস ফয়সাল আকাশ (ছেলে)
বাদী নাছিমা খাতুন (ভুক্তভোগীর স্ত্রী)
অভিযোগ চাঁদাবাজি, মারধর ও ৪০ হাজার টাকা ছিনতাই
বর্তমান অবস্থা আসামিরা পলাতক; গ্রেপ্তারি অভিযান অব্যাহত
পুলিশের বক্তব্য
ধুনট থানা পুলিশ জানিয়েছে, আসামিরা বর্তমানে পলাতক থাকায় তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তবে পুলিশের একাধিক টিম আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করতে কাজ করছে। জননিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।