এক দলিলেই ৩০ লাখ ঘুষ! পল্লবীর সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার প্রদীপের দুর্নীতির নেপথ্যে কারা?
বাণিজ্যিক জমিকে 'কৃষি' দেখিয়ে প্রায় ৯২ লাখ টাকার সরকারি
রাজস্ব লোপাট | নেপথ্যে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগীরা | 'আইন-আদালত কিছুই করতে পারবে না'—স্থানীয়দের মুখে মুখে আলোচনার ঝড়
বিশেষ প্রতিবেদক:
আইন, বিচার ও আদালত—সবকিছুকেই যেন বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে এক শক্তিশালী প্রশাসনিক দুর্নীতির সিন্ডিকেট! একটি মাত্র দলিল নিবন্ধনকে কেন্দ্র করে ৩০ লাখ টাকা নগদ ঘুষ লেনদেন এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারের প্রায় ৯২ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকির এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে রাজধানীর পল্লবী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে। এই নজিরবিহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির মূল কারিগর পল্লবীর সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার প্রদীপ কুমার বিশ্বাস।
তবে সাধারণ মানুষের মনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—জনস্বার্থবিরোধী এই অপরাধের বিরুদ্ধে কি আদৌ কোনো কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে, নাকি ক্ষমতার দাপট ও ঘুষের শক্তিতে পার পেয়ে যাবেন অভিযুক্তরা? স্থানীয়দের মুখে মুখে এখন একটাই গুঞ্জন—কয়েকটি গণমাধ্যমে মুখরোচক সংবাদ প্রকাশ হলেও শেষ পর্যন্ত আইন কিংবা আদালত এই সিন্ডিকেটের চুলও স্পর্শ করতে পারবে না!
১. 'বাণিজ্যিক' জমি হলো 'কৃষি': সরকারি কোষাগারে ৯২ লাখের বিরাট ধস
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকা মেট্রোপলিটনের অত্যন্ত দামি বাউনিয়া মৌজার ১০ শতাংশ জমি নিবন্ধনের সময় শুরু হয় এই জালিয়াতির ছক। জমির প্রকৃত শ্রেণী ছিল 'বাণিজ্যিক', যা বাজারমূল্য ও রাজস্ব হারের দিক থেকে অত্যন্ত উচ্চমানের। কিন্তু সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার প্রদীপ কুমার বিশ্বাস ও তাঁর চক্রের যোগসাজশে সরকারি নথিপত্রে কৌশলে সেটিকে 'কৃষিজমি' হিসেবে দেখিয়ে নিবন্ধন সম্পন্ন করা হয়।
ভূমি ও নিবন্ধন সংক্রান্ত আইন অনুযায়ী বাণিজ্যিক জমির ওপর প্রযোজ্য ট্যাক্স ও রেজিস্ট্রেশন ফি কৃষিজমির চেয়ে বহুগুণ বেশি। শ্রেণী পরিবর্তনের এই ভয়াবহ জালিয়াতির ফলে এক ধাপে সরকার প্রায় ৯২ লাখ টাকার রাজস্ব হারায়। অভিযোগ রয়েছে, রাষ্ট্রীয় কোষাগারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এই একটি দলিল সম্পাদন করার বিনিময়ে প্রদীপ কুমার বিশ্বাস সরাসরি ৩০ লাখ টাকা নগদ ঘুষ গ্রহণ করেন।
রাজস্ব ও ঘুষ জালিয়াতির চিত্র:
বাউনিয়া মৌজার ১০ শতাংশ বাণিজ্যিক জমির শ্রেণী পরিবর্তন করে 'কৃষিজমি' হিসেবে নিবন্ধিত করা হয়। এতে আনুমানিক রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৯২,০০,০০০ (৯২ লাখ) টাকা এবং অনৈতিক নগদ লেনদেন (ঘুষ) হয়েছে ৩০,০০,০০০ (৩০ লাখ) টাকা।
২. নেপথ্যের কারিগর: সমন্বয়কারী জুবায়ের ও উমেদার সিন্ডিকেট
পল্লবী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে অনিয়ম কেবল একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ইচ্ছায় চলেনি; এর পেছনে সক্রিয় ছিল মধ্যস্বত্বভোগী ও দালালদের এক বিশাল নেটওয়ার্ক। সূত্রে জানা গেছে, ঘুষের এই অর্থ লেনদেন ও পুরো প্রক্রিয়াটি সমন্বয়ের মূল দায়িত্বে ছিলেন দলিল লেখক সমিতির সাবেক নেতা জুবায়ের আহমেদ।
একই সাথে অফিসের মাস্টাররোল বা স্বল্প দৈনিক হাজিরায় কর্মরত উমেদার জসিম ও রাজীব পুরো ঘুষ বাণিজ্যের মাঠপর্যায়ের নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করেছেন। নামমাত্র বেতনে কাজ করা উমেদার জসিম অবৈধ উপার্জনের মাধ্যমে রাজধানী ও বাইরে নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ উঠে এসেছে। সরকারি দপ্তরে থাবা বসানো এই সিন্ডিকেটের প্রভাব কতটা গভীরে, তা এ ঘটনাতেই স্পষ্ট।
৩. ক্ষমতার দাপটে অর্জিত সম্পদের পাহাড়: ফ্ল্যাট, বাড়ি ও শত বিঘা জমি
অভিযোগ রয়েছে, প্রদীপ কুমার বিশ্বাস সার্ভিস জীবনে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত কালো টাকা কেবল নিজের কাছেই রাখেননি; বরং তা ছড়িয়ে দিয়েছেন স্ত্রী, শ্বশুরবাড়ির সদস্য এবং আত্মীয়স্বজনের নামে।
অনুসন্ধানী তথ্যে বেরিয়ে এসেছে:
রাজধানী ঢাকা ও নিজ জেলা গোপালগঞ্জে একাধিক বিলাসবহুল বাড়ি, ফ্ল্যাট ও মূল্যবান প্লট গড়ে তুলেছেন। পাশাপাশি আত্মীয়দের নামে-বেনামে শত শত বিঘা কৃষিজমি ও বাণিজ্যিক সম্পত্তি ক্রয় করা হয়েছে। নিজ এলাকায় বিপুল ব্যয়ে পারিবারিক অবকাঠামো ও মন্দির নির্মাণের তথ্যও সামনে এসেছে।
৪. বদলি কি আদৌ শাস্তি, নাকি লোকদেখানো প্রশাসনিক নাটক?
২০২৫ সালের শুরুতে দুর্নীতির খবর গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে প্রদীপ কুমার বিশ্বাসকে পল্লবী থেকে কুড়িগ্রামের দূরবর্তী চর রাজিবপুর উপজেলায় বদলি করা হয়। কিন্তু সচেতন মহল প্রশ্ন তুলছেন—একটি গুরুতর অপরাধ ও কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির শাস্তি কি শুধুই একটি সাধারণ বদলি?
অতীতের নানা উদাহরণ টেনে স্থানীয় অধিবাসীরা বলছেন, দুর্নীতির অভিযোগে কোনো কর্মকর্তা ধরা পড়লে সাময়িকভাবে একটি দূরবর্তী স্থানে বদলি করে দেওয়া হয়। কিছু দিন পর পরিস্থিতি ঠান্ডা হলে তারা আবার আগের মতো সুবিধাজনক স্থানে ফিরে এসে দুর্নীতির রাজত্ব কায়েম করেন। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং আইনি ব্যবস্থার ধীরগতির কারণে অপরাধীরা অধরাই থেকে যান।
৫. বিচার ও আইন নিয়ে জনমনে সংশয়: আদালতের কাঠগড়ায় কি পৌঁছাবে বিচার?
বর্তমানে এ ঘটনার ফাইল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর অনুসন্ধানী টেবিলে রয়েছে বলে দাবি করা হলেও কাজের গতি নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে সর্বস্তরে। পল্লবী এলাকার ভুক্তভোগী ও সচেতন নাগরিকদের স্পষ্ট বক্তব্য—পত্রপত্রিকায় রিপোর্ট প্রকাশিত হলে কিছুদিন আলোচনা হয়, কিন্তু দিনশেষে কোনো প্রভাবশালী বা ঘুষখোর কর্মকর্তার জেল-জরিমানা হয় না। আইন-আদালত তাদের ক্ষেত্রে নীরব ভূমিকা পালন করে। এই প্রদীপ সাব-রেজিস্ট্রারও ঘুষের টাকায় পার পেয়ে যাবেন—এমনটাই আমরা ধরে নিয়েছি।
প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হয়ে সরকারি কোটি টাকার রাজস্ব লোপাট করা এবং প্রকাশ্য ঘুষ বাণিজ্যের পর বিচার না হওয়া রাষ্ট্রীয় আইনি ব্যবস্থার জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ।
৬. দুদকের কাছে যে জরুরি প্রশ্নগুলোর জবাব চায় দেশবাসী
১. শ্রেণী পরিবর্তন ও রাজস্ব ফাঁকি: সরকারি স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও কীভাবে একটি নথিভুক্ত বাণিজ্যিক জমিকে 'কৃষিজমি' বানিয়ে নিবন্ধিত করা হলো?
২. ঘুষের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ: ৩০ লাখ টাকা ঘুষের অংক কোন পথে কার কার হাত ঘুরে কার কাছে পৌঁছাল, তার আর্থিক ও ব্যাংকিং রেকর্ড বা কল রেকর্ড অনুসন্ধানে উদঘাটন করা হবে কি?
৩. উমেদার ও দালাল চক্রের সম্পৃক্ততা: জুবায়ের, জসিম ও রাজীবদের মতো অবৈধ মধ্যস্বত্বভোগীদের নামে থাকা বিপুল সম্পদের উৎস কী এবং তাদের আইনের আওতায় আনা হবে কবে?
৪. অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণ: প্রদীপ বিশ্বাস ও তাঁর পরিবারের নামে থাকা অসামঞ্জস্যপূর্ণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রাষ্ট্রীয় অনুকূলে বাজেয়াপ্ত ও রাজস্ব পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হবে কি?
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ-এর বার্তা:
রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও ভূমি নিবন্ধনের মতো সংবেদনশীল দপ্তরে যদি এভাবে অনিয়ম ও ঘুষের রাজত্ব চলে, তবে সাধারণ মানুষ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? দেশের বিদ্যমান আইন ও দুর্নীতি দমন কমিশন যদি এই সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির সঠিক তদন্ত করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি করতে না পারে, তবে বিচার ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আর বিন্দুমাত্র আস্থা থাকবে না।
আমরা চাই, এই ঘটনার নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করা হোক এবং ফাঁকি দেওয়া ৯২ লাখ টাকার সরকারি রাজস্ব অনতিবিলম্বে উদ্ধার করা হোক।