রূপগঞ্জে পদে বসেই বেপরোয়া তারাব পৌর শ্রমিক দল নেতা, চাঁদা না পেয়ে ট্রাকচালককে পিটিয়ে পাঠালেন হাসপাতালে
বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, তাওলাদ হোসেন, স্টাফ রিপোর্টার
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার রূপসী ও তারাব শিল্পাঞ্চলে এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম ফজলুল হক প্রধান। সদ্য ঘোষিত তারাব পৌরসভা শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক পদে আসীন হওয়ার পর থেকেই এলাকায় তার অপকর্ম ও ত্রাসের রাজত্ব বহুগুণ বেড়ে গেছে বলে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করছেন স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, অতীতে রাজনৈতিক পরিচয় বদলে বিএনপির সহযোগী সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ পদ পাওয়ার পর থেকেই তিনি চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, ডিজিটাল প্রতারক চক্রের স্বার্থরক্ষা এবং মামলা বাণিজ্যে মেতে উঠেছেন।
তার এই বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের সর্বশেষ শিকার হয়েছেন রুবেল নামের ২৬ বছর বয়সী এক নিরীহ ট্রাকচালক। ১০ হাজার টাকা চাঁদা না দেওয়ায় তাকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে গুরুতর আহত করা হয়েছে বলে থানায় লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে জানা যায়, ভুক্তভোগী রুবেল এশিয়ান ট্রেডার্স নামের একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের ট্রাকচালক হিসেবে কাজ করেন। গত সোমবার সন্ধ্যায় মালামাল বোঝাই ট্রাক নিয়ে তিনি মৈকুলী এলাকায় অবস্থিত কারখানার প্রধান ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এ সময় তারাব পৌর শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক ফজলুল হক প্রধান তার অনুসারীদের নিয়ে ট্রাকটির গতিপথ রোধ করেন এবং সরাসরি ১০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেন। চালক রুবেল চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ফজলুল হক তাকে হুমকি দিয়ে জানান যে টাকা না দিলে কোনো গাড়ি কারখানায় ঢুকতে দেওয়া হবে না। রুবেল এর জোর প্রতিবাদ জানালে ফজলুল হক ও তার সঙ্গীরা তাকে গাড়ি থেকে টেনে নামিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর করে রক্তাক্ত ও গুরুতর আহত করে। রুবেলের আর্তচিৎকারে স্থানীয় লোকজন ও কারখানার শ্রমিকরা ছুটে আসলে হামলাকারীরা প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
পরবর্তীতে স্থানীয়দের সহায়তায় আহত রুবেলকে দ্রুত চিকিৎসার জন্য নিকটস্থ হাসপাতালে পাঠানো হয়। এই ঘটনার পর চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে মঙ্গলবার দুপুরে ভুক্তভোগী ট্রাকচালক রুবেল বাদী হয়ে রূপগঞ্জ থানায় ফজলুল হক প্রধানকে প্রধান আসামি করে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
রূপগঞ্জের স্থানীয় অধিবাসী ও প্রবীণ রাজনৈতিক কর্মীদের অনুসন্ধানে ফজলুল হক প্রধানের রাজনৈতিক রূপ পরিবর্তনের এক চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে। স্থানীয়দের স্পষ্ট অভিযোগ, ফজলুল হক মূলত একজন সুযোগসন্ধানী রাজনৈতিক সুবিধাভোগী। গত সরকারের আমলে তিনি স্থানীয় যুবলীগের মিছিল ও রাজনৈতিক মহড়ায় অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি নিজের আখের গোছাতে রাতারাতি খোলস বদলে তারাব পৌর শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদকের পদ হাতিয়ে নেন। স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, তিনি অতীতে যুবলীগের ঝাণ্ডা তুলে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন, আর এখন শ্রমিক দলের পদকে ঢাল বানিয়ে মৈকুলী ও তারাব শিল্পাঞ্চলে সন্ত্রাসী অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন। তার মূল পরিচয় তিনি একজন পেশাদার চাঁদাবাজ।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, তারাব ও এর আশপাশের এলাকায় জমিজমা কেনাবেচা কিংবা নতুন কোনো ভবন নির্মাণ করতে গেলেই ফজলুল হক প্রধান ও তার সংবদ্ধ চক্রকে নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ চাঁদা দিতে হয়। জমি বিক্রেতা ও ক্রেতাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদা আদায় করা তার নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। শুধু তাই নয়, তার বিরুদ্ধে রয়েছে ভয়াবহ মামলা বাণিজ্যের অভিযোগ। বিকাশ ও নগদকেন্দ্রিক বিভিন্ন ডিজিটাল প্রতারক চক্রের অনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় তিনি আইনি ফাঁকফোকর ও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করেন। স্থানীয় উচ্চপর্যায়ের কতিপয় অসাধু ব্যক্তিবর্গের ছত্রছায়ায় তিনি ওই এলাকার মাদক ব্যবসা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও সংঘবদ্ধ অপরাধের প্রধান কারিগর হয়ে উঠেছেন।
তবে তার বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন তারাব পৌর শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক ফজলুল হক প্রধান। নিজের পক্ষে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি জানান, চাঁদা দাবি বা মারধরের বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা প্রচার। সেদিন তিনি ডাক্তার দেখানোর উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়ে মৈকুলী বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দেখেন এলোমেলোভাবে ট্রাক রাখার কারণে প্রচণ্ড যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। তিনি একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে ড্রাইভারকে ট্রাকটি সঠিকভাবে সরিয়ে রাখতে বললে কেবল সামান্য বাকবিতণ্ডা হয়। এরপর তিনি হাসপাতালে চলে যান এবং সেখানে কোনো চাঁদা দাবি বা মারামারির ঘটনা ঘটেনি।
এ বিষয়ে রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এএইচএম সালাউদ্দিন জানান, মৈকুলী এলাকায় ট্রাকচালকের ওপর হামলা ও চাঁদা দাবির বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ পুলিশ হাতে পেয়েছে। পুলিশ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করছে। তদন্তে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেলে অভিযুক্ত ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
দেশ ও দলের ভবিষ্যতের ওপর প্রভাব এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
তারাব পৌর শ্রমিক দল নেতা ফজলুল হক প্রধানের এই কর্মকাণ্ড কেবল রূপগঞ্জের একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক রাজনীতি, অর্থনীতি ও দলীয় ভাবমূর্তির জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা বহন করে।
প্রথমত, রাজনৈতিক দলের ভাবমূর্তির চরম অবক্ষয় ঘটছে। রূপগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে যখন আইনশৃঙ্খলা ও ব্যবসায়িক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে, তখন তথাকথিত সুবিধাভোগী ও দলবদলু নেতাদের এমন কর্মকাণ্ডের ফলে মূল দলের দীর্ঘদিনের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এই ধরনের হাইব্রিড ও অনুপ্রবেশকারীদের আশ্রয় দিলে ত্যাগী কর্মীরা কোণঠাসা হয়ে পড়েন এবং সাধারণ মানুষের মন থেকে দলের প্রতি আস্থা উঠে যায়।
দ্বিতীয়ত, দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি ও শিল্পাঞ্চলে স্থবিরতা তৈরি হচ্ছে। রূপগঞ্জ ও তারাব এলাকা বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিতে পণ্য পরিবহন ও শিল্প উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি পরিবহন চালক ও ছোট ব্যবসায়ীদের ওপর এভাবে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি ও হামলা চালানো হয়, তবে শিল্পমালিকরা বিনিয়োগের উৎসাহ হারাবেন এবং পরিবহন শ্রমিকদের মাঝে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়বে, যা সার্বিক জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
তৃতীয়ত, আইনি শাসন ও দেশের ভবিষ্যতের ওপর হুমকিস্বরূপ। রাজনীতিকে ব্যবহার করে মামলা বাণিজ্য ও ডিজিটাল প্রতারকদের সুরক্ষা দেওয়ার মতো কর্মকাণ্ড সমাজে অপরাধের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। সময়মতো ফজলুল হক প্রধানদের মতো অপরাধীদের লাগাম টানা না গেলে ক্ষমতার পরিবর্তন সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের যে পুরনো সংস্কৃতি, তার থেকে দেশের মানুষের মুক্তি পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে।
তারাব এলাকার সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা অনতিবিলম্বে ফজলুল হক প্রধান ও তার সন্ত্রাসী চক্রের হাত থেকে মুক্তি চান। কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক দলীয় নেতৃত্ব যদি এসব অনুপ্রবেশকারী ও সুবিধাভোগীদের দল থেকে বহিষ্কার না করে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি নিরপেক্ষ আইনি ব্যবস্থা না নেয়, তবে রূপগঞ্জের শান্ত শিল্পাঞ্চল আবারো অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।