
মোঃ শাহজাহান বাশার, স্টাফ রিপোর্টার:
টাঙ্গাইল জেলার ভূঞাপুর উপজেলা খাদ্য গুদামে সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহ, ভিডিও ধারণ এবং সরাসরি সম্প্রচারে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে জেলা খাদ্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, এই নিষেধাজ্ঞা একটি লিখিত আদেশের মাধ্যমে জারি করা হয়েছে, যেখানে ডিজি (মহাপরিচালক) বরাতে নির্দেশ দেওয়া হয়, কেপিআই (Key Point Installation) এলাকায় সাংবাদিকদের প্রবেশ, ভিডিও ধারণ বা সাক্ষাৎকার নেওয়া সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ।
রবিবার (১৫ জুন) ডিবিসি নিউজসহ কয়েকটি গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা ভূঞাপুর উপজেলা খাদ্য গুদামে বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ যাচাই করতে গেলে, গুদাম কর্মকর্তারা হোয়াটসঅ্যাপ বার্তার একটি স্ক্রিনশট দেখিয়ে বলেন, “এইমাত্র ডিজি মহাদয়ের সাথে কথা বললাম। কোনো সাংবাদিকের গুদামের টেরিটোরির মধ্যে ঢুকে লাইভ করার কোনো সুযোগ নাই। গুদামের অভ্যন্তরে ঢুকে কোনো সাক্ষাৎকার এবং কোনো লাইভ করতে দিবেন না। এতে মহাপরিচালক মহোদয়ের সদয় সম্মতি রয়েছে।”
এছাড়া বার্তায় আরও লেখা ছিল, “যদি সাক্ষাৎকার এবং লাইভ করতে হয় তাহলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিতে হবে। যেহেতু আমাদের গুদাম কেপিআই এরিয়ায়। আপনারা মনে রাখবেন, আমরা সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছি। মন্ত্রণালয়ের এই সংগ্রহ কার্যক্রমকে সবাই মিলে সফল করব—এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।”
তবে সাংবাদিকদের প্রশ্ন—এমন কড়া নিষেধাজ্ঞা শুধু তথ্য লুকাতে বা পূর্বে প্রকাশিত দুর্নীতিগুলো ধামাচাপা দেওয়ার জন্যই দেওয়া হয়েছে কিনা?
উল্লেখ্য, এই গুদাম সংক্রান্ত অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য ইতিপূর্বে একাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। ডিবিসি নিউজসহ বেশ কিছু জাতীয় গণমাধ্যম রিপোর্ট প্রকাশ করলে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সেখানে অভিযান চালিয়ে অভিযোগের সত্যতা পায়। গুদামের খাদ্যশস্য মজুদ, ওজন, রক্ষণাবেক্ষণসহ নানা খাতে চরম অব্যবস্থাপনার প্রমাণও মেলে।
তাই বিশ্লেষকদের মতে, সাংবাদিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা, ভিডিও ধারণ ও লাইভ সম্প্রচারে বাধা দেওয়ার আদেশ আসলে আগের দুর্নীতির তথ্য আড়াল করার অপচেষ্টা হতে পারে।
এই বিষয়ে 'সুশাসনের জন্য নাগরিক' (সুজন) এর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক খান মোহাম্মদ খালেদ বলেন, “কেপিআই এরিয়ায় সাংবাদিকরা প্রবেশ করতে পারবেন না—এটা সাংবাদিকরাও জানেন। কিন্তু সাংবাদিকদের প্রবেশ আটকে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে এমন বার্তা দেওয়া শুধু সাংবাদিকদের দায়িত্বশীলতাকে অপমানই নয়, বরং নিজেদের দায়িত্বকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এতে পরিষ্কার বোঝা যায়, কিছু লুকানো হচ্ছে। সাধারণ মানুষের কাছে এটি দুর্নীতি রক্ষার এক প্রকার অপচেষ্টা বলে প্রতিভাত হয়।”
এই বিষয়ে জেলা খাদ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ মইনুল ইসলাম ভুঞার সঙ্গে সাংবাদিকরা ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি সংক্ষিপ্তভাবে বলেন,
“কেপিআই এলাকায় প্রবেশ নিষেধ।”তবে এরপর যখন সাংবাদিকরা তথ্য অধিকার আইন ও সাংবাদিক নীতিমালার বিষয় টানেন, তখন তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্য অধিদপ্তর একটি জনসম্পৃক্ত দপ্তর। খাদ্য নিরাপত্তা ও গুদামের অবস্থা জানার অধিকার জনগণের রয়েছে, এবং সাংবাদিকরা সে কাজই করেন। কোনো অফিস কেপিআই হলেও সেটি আইনগত কাঠামোর মধ্যে থাকে। তথ্য অধিকার আইন ২০০৯-এর ৪ ধারায় উল্লেখ রয়েছে—জনগণ যেকোনো সরকারি দপ্তরের তথ্য চাওয়ার অধিকার রাখে। শুধু রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত কিছু তথ্য ব্যতিক্রম।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের একজন অধ্যাপক বলেন,“কোনো সরকারি কর্মকর্তা সাংবাদিকদের এভাবে হুমকি দিতে পারেন না। যদি অনুমতি প্রয়োজন হয়, তবে তারা যৌথভাবে তা সমাধান করতে পারতেন। কিন্তু হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় ‘নিষেধাজ্ঞা’ জারি করা স্পষ্ট অসাংবিধানিক।”
ঘটনার পর টাঙ্গাইল প্রেস ক্লাব, সাংবাদিক ইউনিয়ন ও জাতীয় সাংবাদিক সংগঠনগুলো প্রতিবাদ জানিয়েছে। তারা বলেছে,
“সংবিধানে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা আছে। এ ধরনের আচরণ গণতন্ত্রের জন্য হুমকি। আমরা অবিলম্বে তদন্ত দাবি করছি।”
১. ঘটনাটি তদন্তে স্বাধীন কমিটি গঠন
২. হোয়াটসঅ্যাপ বার্তার সত্যতা যাচাই
৩. ডিজি মহোদয়ের বক্তব্য প্রকাশ
৪. তথ্য অধিকার আইনের প্রতি সম্মান নিশ্চিত
৫. সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে গাইডলাইন
এই ঘটনা বাংলাদেশের সাংবাদিকতা পেশা ও সরকারি তথ্য ব্যবস্থাপনার মধ্যে একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে। তথ্য লুকিয়ে রেখে গণতন্ত্র রক্ষা করা যায় না। বরং তথ্য উন্মুক্ত রাখলেই দুর্নীতি রোধ ও সুশাসন নিশ্চিত হয়।
প্রশ্ন উঠছে—খাদ্য গুদামে এমন কী ঘটছে, যা সাধারণ মানুষের জানাও অপরাধ হয়ে দাঁড়াল?