জেলের ছদ্মবেশে লুকিয়ে থাকা এসিড নিক্ষেপকারী গ্রেফতার: ঝিকরগাছা থানার পুলিশের চাঞ্চল্যকর অভিযান
ঝিকরগাছা, যশোর | ১৮ জুলাই ২০২৫
রিপোর্ট :বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ ডেস্ক
প্রায় ১৫ দিন ধরে পলাতক থাকা চাঞ্চল্যকর এসিড নিক্ষেপ মামলার প্রধান আসামিকে জেলের ছদ্মবেশে অভিনব পন্থায় গ্রেফতার করল ঝিকরগাছা থানা পুলিশ। নদী, বিল ও গোপন অবস্থান পাল্টে পাল্টে আত্মগোপনে থাকা আসামি জসীমকে অবশেষে গ্রেফতার করা সম্ভব হয় এক সাহসী অভিযানে, যেখানে পুলিশের এসআই পর্যন্ত পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
ঘটনার পটভূমি
ভিকটিম নারী প্রায় ছয় বছর আগে নাভারণ এলাকায় বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। পারিবারিক কলহের জেরে ডিভোর্সের মাধ্যমে সেই সম্পর্কের সমাপ্তি ঘটে। বর্তমানে চার বছর বয়সী সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে অবস্থান করছিলেন তিনি।
অভিযুক্ত জসীম (৪০), পেশায় দিনমজুর এবং ভিকটিমের পাড়ার এক বাড়িতে ভাড়াটিয়া হিসেবে থাকতেন। একই এলাকায় বসবাস করায় তার নিয়মিত ভিকটিমের বাড়িতে যাতায়াত ছিল। একপর্যায়ে জসীম ভিকটিমকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়, যা ভিকটিম ও তার পরিবার সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে। এরপর থেকেই জসীম নানা উপায়ে ফোনে বিরক্ত করতে থাকে এবং প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে।
ভয়াল রাতের ঘটনা
গত ৩ জুলাই রাত ৮টার দিকে, ভিকটিমের বাড়ির পুরুষ সদস্যরা বাজারে গেলে জসীম সুযোগ নেয়। সে ঘরের জানালার পাশে লুকিয়ে থেকে এসিড নিক্ষেপ করে। এতে ভিকটিম, তার মা এবং আট বছরের ছোট ভাই ভয়াবহভাবে আহত হন। এসিডের ছিটে শরীরের বিভিন্ন স্থানে পড়ে ঝলসে দেয় তাদের।
চিৎকার-চেঁচামেচির পর স্থানীয়রা ছুটে এসে তিনজনকেই উদ্ধার করে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে। ভিকটিমের বাবা পরবর্তীতে ঝিকরগাছা থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
আসামি ধরতে পুলিশের অভিযান
এসিড সন্ত্রাসের এই ঘটনায় যশোর জেলা পুলিশ সুপার বিষয়টিকে চরম গুরুত্ব দিয়ে দ্রুততম সময়ে আসামিকে গ্রেফতারে একাধিক ইউনিটকে নির্দেশ দেন। ঝিকরগাছা থানা পুলিশের নেতৃত্বে অভিযানে নামে কয়েকটি টিম।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ জানতে পারে আসামি নড়াইল জেলার আমাদাহ নামক এক প্রত্যন্ত এলাকায় লুকিয়ে আছে। কিন্তু সে এক জায়গায় না থেকে বারবার অবস্থান পাল্টাতে থাকায় পুলিশকে হিমশিম খেতে হয়।
শেষপর্যন্ত পুলিশ জানতে পারে, আসামি লোহাগড়া, নড়াইল সদর ও কালিয়ার মধ্যবর্তী বিশাল বিল ‘কামাল প্রতাপ’-এর মাঝখানে লুকিয়ে আছে।
অভিযান ও গ্রেফতার
গত ১৭ জুলাই, এসআই তাপসের নেতৃত্বে একটি আভিযানিক দল জেলের ছদ্মবেশ ধারণ করে বিলের মাঝখানে পৌঁছায়। পুলিশের উপস্থিতি বুঝতে পেরে জসীম পানিতে ঝাঁপ দেয়। তবে এসআই তাপসও সাহসিকতার সঙ্গে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তাকে নিয়ন্ত্রণে আনেন।
পরবর্তীতে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামি ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে।
আদালতে সোপর্দ
গ্রেফতারকৃত আসামিকে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিচারিক আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় আরও তদন্ত চলছে এবং প্রয়োজনীয় সব সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হবে।
এই ঘটনা শুধু নারী নির্যাতনের এক ভয়াবহ উদাহরণ নয়, বরং পুলিশের পেশাদারিত্ব ও সাহসিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। একইসাথে এটি সমাজকে সতর্ক করছে—প্রত্যাখ্যানকে আক্রমণের কারণ বানানো যাবে না, এবং অপরাধী যত গভীরেই লুকাক, রাষ্ট্রের হাত তাকে খুঁজে বের করবেই।