তারিখ: ৪ আগস্ট ২০২৫
বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ ডেস্ক
জনতার কণ্ঠস্বর
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘চেয়ার’ একটি প্রতীক মাত্র নয়, এটি একাধারে নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য, ও প্রভাব বিস্তারের এক কঠিন বাস্তবতার নাম। মো. শাহজাহান বাশার তাঁর এই বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদনে তুলে ধরেছেন—কীভাবে আমাদের রাজনৈতিক, আমলাতান্ত্রিক, এমনকি সামাজিক সংগঠনগুলোতে ‘চেয়ারের অধিকার’ই নির্ধারণ করে কার কথা শেষ কথা হবে।
চেয়ার মানেই ক্ষমতা: বাস্তবতা যত নির্মম
একজন ব্যক্তি যতই মেধাবী, দূরদর্শী, দেশপ্রেমিক বা জনদরদী হোন না কেন—যদি তার পিছনে কোনো চেয়ার না থাকে, তবে তার কথার ওজন থাকে না। অথচ, একজন ব্যক্তি যদি শুধুমাত্র একটি পদবী নিয়ে কথা বলেন—চেয়ারম্যান, সভাপতি, মহাসচিব, কিংবা নির্বাহী সদস্য—তবে সেই কথার ভেতরে থাকে প্রশাসনিক কর্তৃত্ব, প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা এবং অগাধ শ্রবণযোগ্যতা।
বাংলাদেশে বহু উদাহরণ রয়েছে যেখানে ‘আমি চেয়ারম্যান’ লাইনটি যেন এক ধরণের ইমিউনিটি হিসেবে কাজ করে। ব্যক্তি যা বলেন, তা আলোচনার ঊর্ধ্বে চলে যায়। শুধু বলার ধরন নয়, কথাটি কোন চেয়ার থেকে বলা হচ্ছে—সেটাই হয়ে দাঁড়ায় সবচেয়ে বড় ‘যুক্তি’।
চেয়ারের রাজনীতি: দালালি, ভাগ-বাটোয়ারা ও পলিসি বিপর্যয়
চেয়ারের জন্য শুধু বাহ্যিক রাজনীতিতে নয়, দলীয় অভ্যন্তরেও চলে ষড়যন্ত্র, বিশ্বাসঘাতকতা ও প্রচারযুদ্ধ। অনেক প্রতিভাবান নেতা শুধুমাত্র পদহীন থাকায় বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছেন। কারণ বাংলাদেশে চেয়ারহীন রাজনীতি হচ্ছে—ভোকাল হয়ে কান্না করার নাম, অথচ কেউ শুনবে না।
এই চেয়ার ঘিরেই গড়ে ওঠে তদবির-সিন্ডিকেট, পরিবারতন্ত্র, সুবিধাবাদী লবি এবং প্রশাসনিক পক্ষপাত। এমনকি অনেকে চেয়ারে বসে গিয়ে মানুষ বদলে যান। ভাষা পাল্টে যায়, মূল্যবোধ বদলে যায়, নৈতিকতা নির্লজ্জ দ্বৈত মানদণ্ডে পরিণত হয়।
যা একসময় নিজে অন্যায় মনে করতেন, চেয়ারে বসে সেটিই হয়ে যায় ‘নৈতিক দায়িত্ব’ বা ‘নীতির প্রশ্ন’। আর যা একসময় প্রশ্নবিদ্ধ ছিল, চেয়ারে বসে সেটিকে নিরঙ্কুশ নীতিমালায় রূপান্তর করা হয়।
চেয়ারের মোহ: প্রটোকল, ক্যামেরা আর জনগণকে পদতলে রাখার কৌশল
বাংলাদেশে চেয়ারে বসা মানে শুধুমাত্র পদাধিকার নয়—এটি হয়ে দাঁড়ায় এক ধরনের স্ট্যাটাস কোড। চারদিকে প্রটোকল, মিডিয়ায় মুখ, ডান-বাঁয়ে চাটুকার, আর নিচে এক প্রজন্মের অসহায় চাওয়া—এটাই যেন চেয়ারের চারপাশের বাস্তবতা।
তবে ইতিহাস বলে, এই চেয়ার কোনোদিন চিরস্থায়ী নয়। একসময় যিনি রাষ্ট্র চালাতেন, তিনিই একদিন আদালতে দণ্ডিত আসামী, কিংবা নির্বাক পথচারী। এই সত্য সত্ত্বেও রাজনীতিবিদ হোক কিংবা আমলা, কেউই ক্ষমতা ছাড়ার আগে নিজের দায়িত্বকে বিবেক দিয়ে মূল্যায়ন করতে চান না।
সমাধান: চেয়ারের সংস্কৃতি নয়, দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি গড়তে হবে
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—চেয়ারের সংস্কৃতি ভাঙা। ব্যক্তি নয়, সিদ্ধান্ত আসবে বাস্তবতার ভিত্তিতে। চাটুকার নয়, মূল্যায়ন হবে জনগণের স্বার্থকে ঘিরে। আমরা চাই এমন রাষ্ট্রব্যবস্থা যেখানে চেয়ার ক্ষমতার প্রতীক নয়, বরং জবাবদিহিমূলক দায়িত্বের প্রতীক হবে।
চেয়ার থাকুক সেই ব্যক্তির হাতে, যিনি জনগণের জন্য কাজ করেন, দল বা সংগঠনের আদর্শ রক্ষা করেন, এবং নিজের আচরণে জনগণের উপর ভরসা তৈরি করতে পারেন।
চেয়ার যদি দায়বদ্ধতার ভাষা হয়, তাহলে সেটি হতে পারে দেশ গঠনের হাতিয়ার। অন্যথায়, এটি হয়ে দাঁড়ায় লুটপাট, দম্ভ, আর জাতির ভবিষ্যৎ ধ্বংসের বীজ।