একই গাড়ির একই ধরনের কাজ একাধিকবার অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ, যন্ত্রাংশ সরবরাহ ও ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন; তদন্ত কমিটি গঠন করেছে চসিক, অভিযোগ অস্বীকার প্রকৌশলীর
নিজস্ব প্রতিবেদক | দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) ৪৬টি গাড়ি ও ভারী যন্ত্রপাতি মেরামতের দরপত্র ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। একই গাড়ির একই ধরনের মেরামতকাজ একাধিকবার দরপত্রে অন্তর্ভুক্তি, বিপুলসংখ্যক গাড়ির যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং সামগ্রিক ব্যয়ের হিসাব নিয়ে স্বচ্ছতার ঘাটতির অভিযোগে প্রশ্নের মুখে পড়েছেন চসিকের যান্ত্রিক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রুবেল চন্দ্র দাস।
অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
৪৬টি পৃথক কাজের দরপত্র, ব্যয়ের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ১৯ আগস্ট প্রকাশিত দরপত্র বিজ্ঞপ্তিতে চসিকের ৪৬টি পৃথক কাজের তালিকা দেওয়া হয়। এসব কাজের মধ্যে রয়েছে ময়লার গাড়ির ইঞ্জিন ও গিয়ারবক্স সংস্কার, গাড়ির বডি ও কেবিন মেরামত, ডেন্টিং-পেইন্টিং, বিভিন্ন যন্ত্রাংশ পরিবর্তন, টায়ার সরবরাহ, কনটেইনার মেরামত এবং ভারী যন্ত্রপাতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ সংস্কার।
দরপত্র বিজ্ঞপ্তিতে স্বাক্ষর করেন যান্ত্রিক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রুবেল চন্দ্র দাস। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ৩০ আগস্ট দুপুর ১টা পর্যন্ত দরপত্র দলিল কেনা এবং একই দিন দুপুর ২টার মধ্যে দরপত্র জমা দেওয়ার সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল।
তবে ৪৬টি পৃথক কাজের ক্ষেত্রে একই সময়সীমা নির্ধারণ, কাজগুলোর প্রয়োজনীয়তা এবং সম্ভাব্য ব্যয়ের সামগ্রিক হিসাব নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
একই গাড়ির একই কাজ একাধিকবার?
দরপত্রের তালিকায় ২৭৪৩৬২ চেসিস নম্বরের একটি আইশার ময়লার গাড়ির ইঞ্জিন, গিয়ারবক্স, বডি ও কেবিন সংস্কারের কাজ একাধিকবার উল্লেখ থাকার অভিযোগ উঠেছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন গাড়ির জন্য পৃথক প্যাকেজে কাছাকাছি ধরনের মেরামতকাজ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে একই গাড়ির একই ধরনের কাজ একাধিকবার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কি না, কিংবা কাজগুলো পৃথক পর্যায়ের মেরামত কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট গাড়ির চেসিস নম্বর, পূর্ববর্তী মেরামতের ইতিহাস, ওয়ার্ক অর্ডার, যন্ত্রাংশ ক্রয়ের চালান এবং মেরামত-পরবর্তী পরিদর্শন প্রতিবেদন মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
শতাধিক গাড়ির যন্ত্রাংশ সরবরাহের উদ্যোগ
দরপত্রের বিভিন্ন প্যাকেজে বিপুলসংখ্যক গাড়ির যন্ত্রাংশ সরবরাহ ও সংস্কারের কাজ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একটি প্যাকেজে ৩৬টি গাড়ি ও একটি মোটরসাইকেলের যন্ত্রাংশ সরবরাহের কথা রয়েছে। অন্য একটি প্যাকেজে রয়েছে ২৬টি গাড়ির যন্ত্রাংশ সরবরাহ।
এ ছাড়া ২৪টি, ২৩টি, ১২টি ও পাঁচটি গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং সংস্কারের কাজও তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
এত বিপুলসংখ্যক গাড়ির যন্ত্রাংশ কেনার ক্ষেত্রে প্রকৃত প্রয়োজনীয়তা নিরূপণ, বাজারদর যাচাই, যন্ত্রাংশের গুণগত মান এবং সরবরাহের পরিমাণ যথাযথভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
ভারী যন্ত্রপাতি ও বর্জ্য কনটেইনার সংস্কারেও প্রশ্ন
শুধু ময়লার গাড়ি নয়, হালিশহরের আনন্দবাজার বর্জ্যাগারে ব্যবহৃত শৃঙ্খলচালিত ভারী মাটি কাটার যন্ত্র, আরেফিন নগর বর্জ্যাগারের দীর্ঘ বাহুবিশিষ্ট খননযন্ত্র এবং জল-স্থলে চলাচল করতে সক্ষম খননযন্ত্রের বিভিন্ন অংশ মেরামতের কাজও দরপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পাশাপাশি নগরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে বর্জ্য সংগ্রহে ব্যবহৃত ১৫টি ধাতব কনটেইনারসহ আরও কয়েকটি ইস্পাতের কনটেইনার সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এসব ভারী যন্ত্রপাতি ও কনটেইনারের বর্তমান অবস্থা, মেরামতের প্রকৃত প্রয়োজন এবং নির্ধারিত ব্যয়ের যৌক্তিকতা যাচাই করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
সামগ্রিক ব্যয় প্রকাশ না হওয়ায় স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ক
৪৬টি পৃথক কাজের দরপত্র বিজ্ঞপ্তিতে সামগ্রিক সম্ভাব্য ব্যয়ের কোনো অঙ্ক উল্লেখ না থাকায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
যদিও প্রতিটি কাজের প্রাক্কলিত ব্যয় সংশ্লিষ্ট দরপত্র দলিলে থাকার কথা, তারপরও সব প্যাকেজের সম্মিলিত ব্যয়, অর্থের উৎস এবং মেরামতের প্রয়োজনীয়তার পূর্ণাঙ্গ চিত্র জনসমক্ষে স্পষ্ট নয় বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
বিশেষ করে পুরোনো গাড়িগুলোর বয়স, বর্তমান বাজারমূল্য, যান্ত্রিক অবস্থা এবং মেরামতের সম্ভাব্য ব্যয়ের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরোনো গাড়ি মেরামতে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের পরিবর্তে নতুন গাড়ি কেনা দীর্ঘমেয়াদে বেশি সাশ্রয়ী হতো কি না, সেটিও নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়নের দাবি উঠেছে।
তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানাল চসিক
অভিযোগের বিষয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সচিব আশরাফুল আমিন বলেন, “রুবেল চন্দ্র দাসের বিরুদ্ধে আনা অনিয়মের অভিযোগগুলো আমরা শুনেছি। অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে ইতোমধ্যে করপোরেশনের নিজস্ব আইনজীবীর মাধ্যমে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। শিগগিরই তাঁর বিরুদ্ধে আনা অনিয়ম ও অভিযোগগুলোর তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাব।”
চসিক সচিবের এই বক্তব্যে অভিযোগগুলো প্রশাসনিকভাবে পর্যালোচনার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। এখন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে কী উঠে আসে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
অভিযোগ অস্বীকার প্রকৌশলী রুবেল চন্দ্র দাসের
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী রুবেল চন্দ্র দাস বলেন, “আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, সে সম্পর্কে আমি অবগত নই। এখানে গাড়ি মেরামতের বিষয়ে যে অর্থের হরিলুটের কথা বলা হয়েছে, তা অসম্ভব। কারণ, এখানে আমার একার পক্ষে কোনো দরপত্র আহ্বান করা সম্ভব নয়। আমাদের আরও কয়েকজন প্রকৌশলীসহ সব বিষয় বিবেচনা করে সবশেষে মেয়রের স্বাক্ষরের ভিত্তিতে এসব কাজ করা হয়।”
তিনি আরও বলেন, “৪৬টি দরপত্রের সবগুলোই অনলাইনের মাধ্যমে আহ্বান করা হয়েছে। কমিটির মাধ্যমে যিনি কাজ পেয়েছেন, তাঁকেই কাজ দেওয়া হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে কাউকে কাজ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অনিয়ম-দুর্নীতি করারও সুযোগ নেই। যারা দরপত্রের মাধ্যমে কাজ চেয়েছিল, কিন্তু কাজ পায়নি, হয়তো তারাই এসব কথা বলে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।”
নিজেকে নির্দোষ দাবি করে তিনি বলেন, কমিটির মাধ্যমে স্বচ্ছতার ভিত্তিতেই গাড়ির যন্ত্রাংশ কেনা ও মেরামতের কাজ করা হচ্ছে।
তদারকি বাড়ানোর আশ্বাস পরিচ্ছন্ন বিভাগের
চসিকের পরিচ্ছন্ন বিভাগের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, “আমি নতুন দায়িত্ব নিয়েছি। পূর্বের দাফতরিক কাজে কী অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে, সেটি আমার জানা নেই। শুনেছি, এ বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি আরও জানান, নগরের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনায় পুরোনো গাড়ির যন্ত্রাংশ সংগ্রহ ও মেরামত নিয়ে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সময়মতো পাওয়া যায় না এবং অনেক ক্ষেত্রে যন্ত্রাংশের দামও বেশি। ফলে নির্ধারিত গ্যারেজের বাইরে অন্য গ্যারেজেও অচল গাড়ি সচল করার জন্য যেতে হয়। অন্যথায় নগরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তবে ভবিষ্যতে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং গাড়ির যন্ত্রাংশ কেনার ক্ষেত্রে কঠোর তদারকি করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
তদন্তে যেসব বিষয় গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন
চসিকের ৪৬টি দরপত্রের প্রকৃত চিত্র উদ্ঘাটনে প্রতিটি প্যাকেজের প্রাক্কলিত ব্যয়, দরপত্রে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান, মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ, কার্যাদেশ, চুক্তিপত্র এবং বিল পরিশোধের নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে গাড়ির চেসিস নম্বর অনুযায়ী মেরামতের ইতিহাস, পূর্ববর্তী যন্ত্রাংশ কেনার হিসাব, সরবরাহকারীদের বিল, গ্যারেজের কাজের বিবরণ, মেরামতের আগে ও পরের ছবি এবং প্রকৌশলীদের পরিদর্শন প্রতিবেদন পরীক্ষা করা জরুরি।
কোনো কাজ একাধিকবার অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকলে তার প্রশাসনিক ও কারিগরি ব্যাখ্যা কী, বাস্তবে কাজ সম্পন্ন হয়েছে কি না এবং সরকারি অর্থের বিপরীতে যথাযথ কাজ পাওয়া গেছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তে উঠে আসা প্রয়োজন।
DBPS-এর বক্তব্য
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ (DBPS) মনে করে, নগরবাসীর পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য গাড়ি ও ভারী যন্ত্রপাতি সচল রাখা অত্যন্ত জরুরি। তবে জনস্বার্থে ব্যয় হওয়া প্রতিটি সরকারি টাকার হিসাবও জনগণের কাছে স্বচ্ছ থাকা প্রয়োজন।
৪৬টি দরপত্র ঘিরে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই এবং তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। আর অভিযোগের সত্যতা না মিললে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সুনাম ও পেশাগত অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে।
আইন ও সম্ভাব্য শাস্তি: সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, প্রতারণা ও জালিয়াতি প্রমাণিত হলে কঠোর দণ্ডের বিধান
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের গাড়ি ও ভারী যন্ত্রপাতি মেরামতের ৪৬টি দরপত্র ঘিরে ওঠা অভিযোগ তদন্তে যদি সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি, প্রতারণা, জালিয়াতি কিংবা দায়িত্বের অপব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
১. দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৪০৯ ধারা — সরকারি কর্মচারীর বিশ্বাসভঙ্গ
সরকারি দায়িত্বে থাকা কোনো ব্যক্তি তাঁর ওপর অর্পিত সরকারি অর্থ বা সম্পদ অসাধুভাবে আত্মসাৎ কিংবা আত্মসাতের সুযোগ করে দিলে দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা প্রযোজ্য হতে পারে। এ ধারায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
২. দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা — অপরাধমূলক অসদাচরণ
সরকারি কর্মচারী দুর্নীতিপূর্ণ বা অবৈধ উপায়ে কিংবা নিজের সরকারি পদমর্যাদার অপব্যবহার করে নিজের বা অন্য কারও জন্য আর্থিক সুবিধা অর্জন করলে, অথবা সরকারি সম্পদ অসাধুভাবে আত্মসাৎ করলে এ আইনের ৫(১) ধারার আওতায় অপরাধমূলক অসদাচরণের অভিযোগ আসতে পারে।
এ অপরাধ প্রমাণিত হলে ৫(২) ধারা অনুযায়ী সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। সংশ্লিষ্ট অর্থ বা সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার বিধানও রয়েছে।
৩. দণ্ডবিধির ৪২০ ধারা — প্রতারণা করে অর্থ বা সম্পদ গ্রহণ
ভুয়া তথ্য, প্রতারণা কিংবা অসৎ উদ্দেশ্যে সরকারি অর্থ ছাড় করিয়ে নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে দণ্ডবিধির ৪২০ ধারা প্রযোজ্য হতে পারে। এ ধারায় সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
৪. দণ্ডবিধির ৪৬৮ ও ৪৭১ ধারা — জাল কাগজপত্র ও ভুয়া নথি ব্যবহার
মেরামতের কাজ সম্পন্ন না করেও কাজ সম্পন্ন দেখানো, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি, জাল স্বাক্ষর বা নথি প্রস্তুত কিংবা জাল নথিকে আসল হিসেবে ব্যবহার করার প্রমাণ পাওয়া গেলে পরিস্থিতি অনুযায়ী দণ্ডবিধির ৪৬৮ ও ৪৭১ ধারা প্রযোজ্য হতে পারে।
৪৬৮ ধারায় প্রতারণার উদ্দেশ্যে জালিয়াতির জন্য সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। ৪৭১ ধারায় জাল দলিল জেনেশুনে আসল হিসেবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে জালিয়াতির অপরাধের মতোই শাস্তির বিধান রয়েছে।
৫. সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত আইন ও বিধিমালা
সরকারি ক্রয় কার্যক্রমে অনিয়ম, প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত করা, অসৎ যোগসাজশ কিংবা দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রযোজ্য সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী দরপত্র প্রক্রিয়া পর্যালোচনা, দায়ী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং বিধি অনুসারে দরপত্রে অংশগ্রহণে অযোগ্য ঘোষণার বিষয়ও বিবেচিত হতে পারে।
তদন্তে যেসব বিষয় আইনি গুরুত্ব পাবে
* একই গাড়ির একই মেরামতকাজ একাধিকবার দেখানো হয়েছে কি না।
* বাস্তবে কাজ না করেই বিল উত্তোলন করা হয়েছে কি না।
* সরবরাহ করা যন্ত্রাংশের পরিমাণ ও মানের সঙ্গে বিলের মিল রয়েছে কি না।
* বাজারদরের তুলনায় অতিরিক্ত মূল্য দেখানো হয়েছে কি না।
* দরপত্র মূল্যায়ন ও কার্যাদেশ প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো অসৎ যোগসাজশ ছিল কি না।
* সরকারি অর্থের কোনো অংশ ব্যক্তিগত বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে ব্যবহার হয়েছে কি না।
আইনগত সতর্কতা: একই ধরনের কাজ একাধিকবার দরপত্রে অন্তর্ভুক্ত থাকলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে দুর্নীতি বা আত্মসাতের অপরাধ প্রমাণিত হয় না। কাজের প্রকৃত প্রয়োজন, কারিগরি ব্যাখ্যা, কার্যাদেশ, বিল এবং অর্থ পরিশোধের নথি যাচাই করে অপরাধের উপাদান পাওয়া গেলেই সংশ্লিষ্ট ফৌজদারি ধারা প্রয়োগের প্রশ্ন আসে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে যদি অনিয়ম, সরকারি অর্থের ক্ষতি কিংবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ এ বিষয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের তদন্ত প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করবে।