গোপালগঞ্জ গণহত্যা: আওয়ামী লীগের নিজস্ব স্বীকারোক্তিতেই সেনাবাহিনী ‘টার্গেট প্র্যাকটিস’ চালিয়েছে সাধারণ মানুষের ওপর
— এক গভীর রাজনৈতিক সংকেত ও রাষ্ট্রব্যবস্থার নৈতিক বিপর্যয়
১৮ জুলাই, ২০২৫
ঢাকা | বিশেষ প্রতিবেদন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও মানবিক বাস্তবতা যেন এক নতুন ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে।
গোপালগঞ্জে সেনাবাহিনীর নির্বিচার গুলিতে প্রাণ হারানো অন্তত ১৭ জন নাগরিকের মৃত্যু নিয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ভেরিফাইড অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এমন সব তথ্য উঠে এসেছে, যা ক্ষমতাসীন দলকে নিজস্ব বক্তব্যেই প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে চরম বিতর্কের মুখে ফেলেছে।
কী বলেছে আওয়ামী লীগ?
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে—
> “দেশের জনগণ এখন সেনাবাহিনীর টার্গেট প্র্যাকটিস ম্যাটেরিয়াল।”
“সেনাবাহিনীর নামধারী কসাইদের হাতে প্রাণ হারাল ১৭ জন।”
“আইন এখন সেনাবাহিনীর পবিত্র রাইফেলের নলের মুখে লেখা হয়।”
এই বক্তব্য কেবল বিক্ষোভে নিহতদের প্রতি সহানুভূতি নয়—এটি সরাসরি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে হত্যাযজ্ঞে জড়িত থাকার অভিযোগ। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই অভিযোগটি এসেছে সেই দল থেকে, যারা দীর্ঘদিন যাবৎ রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরে অধিষ্ঠিত এবং সেনাবাহিনীর দায়িত্বশীল কার্যক্রমের নৈতিক-প্রশাসনিক দায়ভার তাদের ঘাড়েই বর্তায়।
একটি আত্মঘাতী স্বীকারোক্তি?
এই প্রেস বিজ্ঞপ্তিকে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক “আত্মঘাতী” স্বীকারোক্তি বলেও অভিহিত করছেন।
কারণ:
আওয়ামী লীগ নিজেই স্বীকার করেছে যে দেশে আইন নেই, সেনাবাহিনী কসাইয়ে পরিণত হয়েছে।
রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বিদেশি স্বার্থ রক্ষার জন্য বাংলার দরিদ্র নাগরিকদের রক্ত ঢালার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
১৯৭১ সালের পাকিস্তানি বাহিনীর চেয়েও আজকের ইউনিফর্মধারীদের নিকৃষ্ট বলে উল্লেখ করা হয়েছে—যা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি চরম অবিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ।
এমন বক্তব্য কেবল মানবাধিকার লঙ্ঘনের আন্তর্জাতিক সমালোচনাকেই উৎসাহিত করবে না, বরং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের চোখে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও প্রশাসনকে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত করার প্রেক্ষাপট তৈরি করতে পারে।
⚖️ আইনের ভার কোথায়?
এই প্রেস রিলিজ অনুযায়ী, এখন আর বিচারব্যবস্থাও কার্যকর নয়—বরং “জনগণের আদালতই প্রকাশ্য দিবালোকেই এই খুনের শোধ তুলবে।”
এই বক্তব্য স্পষ্টতই এক ধরনের “রেভল্যুশনারি জাস্টিস”-এর আহ্বান—যা যে কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক পূর্বাভাস।
কাদের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ?
সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত থাকে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে এবং কার্যত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে পরিচালিত হয়।
তাহলে এ প্রশ্ন তোলা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক:
এই হত্যাকাণ্ডের দায়ভার কার? রাষ্ট্রপ্রধানের? সরকারপ্রধানের? না কি পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের?
যদি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এই দাবি করে যে তারা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে নেই—তবে তারা নিজেরাই একক দশক ধরে ক্ষমতায় থাকার পর এখন রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার দায় কীভাবে এড়াবে?
রাজনৈতিক মূল্যায়ন
এই বিবৃতি এমন সময়ে এসেছে, যখন দেশের ভেতরে একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের বিষয় নিয়ে বিতর্ক চলছে। সেনাবাহিনীর ভূমিকা, নাগরিক নিরাপত্তা, এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ বাড়ছে।
এই প্রেস বিজ্ঞপ্তি মূলত আওয়ামী লীগকে মানবিক পজিশনে রাখতে চাইলেও, এটি রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক কাঠামোর উপর আস্থা বিনষ্ট করে এবং প্রশ্ন তোলে—যদি সেনাবাহিনী এভাবে হত্যা করে থাকে, তবে আপনি এতদিন কী করলেন? আপনি কীভাবে তা থামাতে ব্যর্থ হলেন?
গোপালগঞ্জের রক্তাক্ত বিকেল, রমজান ও দীপ্ত সাহার লাশ, কাঁদতে থাকা মায়েরা, প্রতিবন্ধী বাবার নিঃশব্দ বিলাপ—এই সব মিলিয়ে একটি ইতিহাসের জন্ম হয়েছে।
যে ইতিহাসে শুধু সেনাবাহিনীর নৃশংসতা নয়, ক্ষমতার গদিতে থাকা রাজনৈতিক শক্তির নৈতিক ব্যর্থতা অনিবার্যভাবে লেখা থাকবে।
এই প্রেস বিজ্ঞপ্তি যেন নিজ মুখেই স্বীকার করে নিয়েছে—এই রাষ্ট্র তার জনগণের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
--
সূত্র: বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ভেরিফাইড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে সংগৃহীত প্রেস বিজ্ঞপ্তি