কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে এলজিইডির প্রকৌশলী নাজমুল হকের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও ঘুষ-কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ
কোটপাড়ায় ‘নাজ প্যালেস-১’ নামে পাঁচতলা ভবনসহ একাধিক জমি ও বাড়ির তথ্য; ঠিকাদারি কাজে অনিয়ম এবং আগের কর্মস্থলে দুর্নীতির মামলার তথ্য ঘিরে তদন্তের দাবি
নিজস্ব প্রতিবেদক | দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ
কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ভারপ্রাপ্ত উপজেলা প্রকৌশলী মো. নাজমুল হকের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, ঘুষ ও কমিশন বাণিজ্য এবং সরকারি উন্নয়নকাজে অনিয়মের একাধিক অভিযোগ উঠেছে। কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন এলাকায় তাঁর জমি ও বাড়ি রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের কয়েকজন। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
স্থানীয় সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, কুষ্টিয়া শহরের কোটপাড়া এলাকায় নাজমুল হকের মালিকানাধীন বলে পরিচিত ‘নাজ প্যালেস-১’ নামে একটি পাঁচতলা ভবনের সন্ধান পাওয়া গেছে। ভবনটির সামনে ‘ইঞ্জিনিয়ারের বাড়ি’ লেখা একটি নেমপ্লেট রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, আনুমানিক ২০১০ সালের দিকে ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রথমে দোতলা নির্মাণের পর কিছু সময় কাজ বন্ধ ছিল। পরে আরও তিনতলা নির্মাণ করে ভবনটি পাঁচতলায় উন্নীত করা হয়।
অভিযোগকারীদের দাবি, ভবনটির নির্মাণ ও অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে। এ ছাড়া কুষ্টিয়া শহরের অন্যান্য স্থানেও তাঁর জমি ও বাড়ি রয়েছে বলে স্থানীয়দের কাছ থেকে তথ্য পাওয়া গেছে। সরকারি চাকরি থেকে অর্জিত আয়, আয়কর নথি ও ঘোষিত সম্পদের সঙ্গে এসব স্থাবর সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
ঠিকাদারি কাজে কমিশন নেওয়ার অভিযোগ
নাজমুল হকের বিরুদ্ধে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ ও বিল ছাড়ের ক্ষেত্রে ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, বেনামে বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ পরিচালনা এবং ঠিকাদারদের কাছ থেকে বিভিন্ন হারে অর্থ আদায়ের ঘটনাও ঘটেছে।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগপন্থী কয়েকজন ঠিকাদারের লাইসেন্স ব্যবহার করে সরকারি কাজ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব কাজের ক্ষেত্রেও কমিশন লেনদেন হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সংশ্লিষ্ট কার্যাদেশ, বিল-ভাউচার, ব্যাংক লেনদেন কিংবা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিকানা-সংক্রান্ত নথি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
আগের কর্মস্থলেও দুর্নীতির মামলা থাকার তথ্য
এর আগে মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলায় দায়িত্ব পালনকালে কাজ না করেই বিল উত্তোলনের অভিযোগে নাজমুল হকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে। মামলাটির নম্বর, দায়েরের তারিখ, অভিযোগের বিস্তারিত এবং বর্তমান বিচারিক অবস্থা যাচাই করা প্রয়োজন। মামলায় নাম থাকা বা অভিযোগ উত্থাপিত হওয়া মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়।
এদিকে, ২০২৬ সালের ১১ মে কুমারখালী সিভিল আদালতে দায়ের করা একটি মামলায় নাজমুল হককে ১৭ নম্বর বিবাদী করা হয়েছে বলেও তথ্য পাওয়া গেছে। মামলাটির আরজি, বিরোধের বিষয়বস্তু এবং তাঁর বিরুদ্ধে সেখানে কী ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছে, তা আদালতের নথি থেকে যাচাই করা প্রয়োজন।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি স্থানীয়দের
স্থানীয়দের অভিযোগ, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে নাজমুল হক প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো যথাযথভাবে তদন্ত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে দাবি তাঁদের।
অভিযোগকারীরা তাঁর নামে-বেনামে থাকা সম্পদ, ব্যাংক হিসাব, আয়কর বিবরণী, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, প্রকল্পের কার্যাদেশ, কাজের বাস্তব অগ্রগতি এবং বিল পরিশোধের নথি যাচাই করার জন্য দুদক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি
অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে ভারপ্রাপ্ত উপজেলা প্রকৌশলী মো. নাজমুল হকের বক্তব্য এ প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পাওয়া যায়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।
এ বিষয়ে দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ বা গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া গেলে দুদক আইন অনুযায়ী তা যাচাই ও তদন্ত করে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী অবৈধ সম্পদ বা ব্যাংক হিসাব জব্দসহ আদালতের নির্দেশনা অনুসারে অন্যান্য পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ-এর পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি—অভিযোগগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য জনসম্মুখে তুলে ধরা হোক। একই সঙ্গে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্য ও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার নিশ্চিত করা হোক।
নোট: এ প্রতিবেদনে উল্লিখিত বিষয়গুলো অভিযোগ ও প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে উপস্থাপিত। স্বাধীনভাবে যাচাই না হওয়া পর্যন্ত কোনো অভিযোগকে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না।