কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের হোস্টেলে গাঁজা সেবন: শিক্ষার্থী আটক, শিক্ষকদের অবহেলায় উঠছে জবাবদিহির প্রশ্ন
রফিকুল ইসলাম রফিক, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
কুড়িগ্রাম | ১৪ জুলাই ২০২৫
কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের ‘বিজয়-২৪’ ছাত্রাবাসে গাঁজা সেবনের সময় হাতেনাতে ধরা পড়েছেন অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী পার্থ ঘোষ। ঘটনার সময় ছাত্রাবাসে অবস্থানরত সহপাঠীরা তাকে আটক করে হল সুপারের মাধ্যমে পুলিশের হাতে তুলে দেয়।
অভিযুক্ত পার্থ ঘোষ ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে অনার্সে ভর্তি হন এবং দীর্ঘদিন ধরেই ছাত্রাবাসে অবস্থান করছিলেন।
ঘটনা কীভাবে ঘটল?
১৩ জুলাই (রবিবার) ইনকোর্স পরীক্ষা শেষে বিকেলে প্রবল বৃষ্টির সময় তিনি ৩০৪ নম্বর কক্ষে আশ্রয় নেন। অভিযোগ রয়েছে, সেসময় তিনি কক্ষে বসে গাঁজা সেবন শুরু করলে অন্য শিক্ষার্থীরা বিষয়টি ধরে ফেলেন। বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গে জানানো হয় হল সুপার সামিউল ইসলামকে।
তিনি জানান,
> “ঘটনার খবর পেয়ে আমি সঙ্গে সঙ্গেই হলে গিয়ে বিষয়টি নিশ্চিত হই এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করি। পরে অভিযুক্তকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়।”
ছাত্রাবাসে দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা দুর্বলতা
ছাত্রাবাসের বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, হলের সিসিটিভি ক্যামেরাগুলোর বড় একটি অংশ নষ্ট হয়ে পড়েছে।
রাতে একাধিকবার সাইকেল চুরি হয়েছে।
ওয়াশরুম থেকে হারিয়েছে মোবাইল চার্জার, সাবান, জুতা ও ব্যক্তিগত মালামাল।
তারা দাবি করেছেন, বারবার অভিযোগ করেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি প্রশাসন।
প্রশাসনিক অবহেলা ও শিক্ষকদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ
এই ঘটনার পর শিক্ষার্থীরা কেবল পার্থ ঘোষ নয়, হোস্টেল ও কলেজ প্রশাসনের দিকেও অভিযোগের আঙুল তুলেছেন।
কেন মাদকের মতো মারাত্মক অপরাধ ঘটলো অথচ কারো চোখে পড়লো না?
কেন ছাত্রদের নিরাপত্তা নেই?
কেন পূর্বের চুরি, অনিয়মের ঘটনা উপেক্ষা করা হলো?
বিশেষভাবে শিক্ষার্থীরা বলছেন, হল সুপার, সহকারী হল সুপার এবং ছাত্রকল্যাণ কর্মকর্তারা নিয়মিত তদারকি করেন না। দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তার ফলেই আজকের এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি।
আইন অনুযায়ী সম্ভাব্য শাস্তি
বাংলাদেশ সরকারি কলেজ আইন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা বিধি অনুযায়ী—
দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা যদি অপরাধ গোপন করেন বা পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত, শোকজ, সাময়িক বরখাস্ত এবং স্থায়ীভাবে চাকরি থেকে বরখাস্তের বিধান রয়েছে।
যদি প্রমাণিত হয় কোনো শিক্ষক (যেমন, আইনুদ্দিন নামক কর্মকর্তা) এ ধরনের অব্যবস্থাপনায় সম্পৃক্ত বা প্রশ্রয়দাতা, তবে তার বিরুদ্ধেও প্রশাসনিকভাবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
শিক্ষার্থীদের স্পষ্ট বক্তব্য
শিক্ষার্থীরা একবাক্যে বলছেন—
> "যারা নিয়ম মানে না, দায়িত্ব নেয় না — তাদের স্থান শিক্ষকতার মতো পবিত্র জায়গায় নেই। আইনুদ্দিনদের মতো ব্যক্তিরা আমাদের দুর্দশার নায়ক। প্রশাসনের উচিত— শুধু ছাত্রকে নয়, যারা এই অব্যবস্থাপনার রক্ষক হয়ে উঠেছে, তাদেরও বিচারের আওতায় আনা।"
এ ঘটনা নিছক মাদকসেবনের ঘটনা নয়। এটি একটি অকার্যকর প্রশাসন, তদারকিহীন শিক্ষকতন্ত্র এবং নিরাপত্তাবর্জিত শিক্ষাঙ্গনের প্রতিচ্ছবি। পার্থ ঘোষের মতো একজন শিক্ষার্থীর অপরাধের দায়ে যেমন তাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে, তেমনি যাদের নিষ্ক্রিয়তা এই অপরাধকে সম্ভব করেছে— তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনাই হবে ন্যায়ের পথ।