অষ্টগ্রাম (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি:
কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চল অষ্টগ্রামে দেশীয় প্রজাতির মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক জলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং মুক্ত জলাশয়ে মাছের প্রাপ্যতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ধলেশ্বরী নদীতে ২৭০ কেজি দেশীয় মাছের পোনা অবমুক্ত করা হয়েছে। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর ২০২৬) দুপুরে উপজেলার কাস্তুল বাজার লঞ্চঘাট এলাকায় উপজেলা মৎস্য দপ্তরের উদ্যোগে এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়।
কর্মসূচিতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে ধলেশ্বরী নদীতে মাছের পোনা অবমুক্ত করেন অষ্টগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাথী দাস। এ সময় সরকারি কর্মকর্তা, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, হাওরাঞ্চলের নদ-নদী ও মুক্ত জলাশয়ে দেশীয় প্রজাতির মাছের পোনা অবমুক্ত করার এ ধরনের উদ্যোগ মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় মৎস্যজীবীদের জীবিকা রক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
উপজেলা মৎস্য দপ্তরের উদ্যোগে কর্মসূচি
অষ্টগ্রামের কাস্তুল বাজার লঞ্চঘাটসংলগ্ন ধলেশ্বরী নদীতে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে উপজেলা মৎস্য দপ্তরের কর্মকর্তারা অংশ নেন। কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো নদী ও মুক্ত জলাশয়ে দেশীয় প্রজাতির মাছের বিস্তার বাড়ানো এবং প্রাকৃতিক মৎস্যসম্পদের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সহায়তা করা।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অমিত পণ্ডিত, উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নিজামুল হক নজরুল, সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম শাহীন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন ইয়াকুব এবং উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি নজরুল ইসলাম সাগরসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীরা দেশীয় মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি ও জলজ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
দেশীয় মাছ সংরক্ষণে পোনা অবমুক্তকরণের গুরুত্ব
বাংলাদেশের হাওরাঞ্চল প্রাকৃতিক মৎস্যসম্পদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভান্ডার। নদী, খাল, বিল ও বিস্তীর্ণ জলাভূমি এসব অঞ্চলের মানুষের খাদ্য, পুষ্টি, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। বিশেষ করে অষ্টগ্রামের মতো হাওরপ্রধান উপজেলায় মাছের প্রাপ্যতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, দেশীয় প্রজাতির মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি, জলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং মুক্ত জলাশয়ে মাছের প্রাপ্যতা বাড়াতে পোনা অবমুক্তকরণ কার্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নদীতে অবমুক্ত করা পোনা অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ পেলে তা ভবিষ্যতে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে।
তাঁরা আরও বলেন, মাছ শুধু মানুষের খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদা পূরণ করে না; হাওরাঞ্চলের বহু পরিবারের জীবিকা ও আর্থসামাজিক অবস্থার সঙ্গেও সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই দেশীয় মাছের প্রজনন ও বংশবৃদ্ধির পরিবেশ রক্ষা করা এবং প্রাকৃতিক জলাশয়ে মাছের বিচরণ ও বেঁচে থাকার উপযোগী পরিবেশ বজায় রাখা জরুরি।
হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান
বক্তারা উল্লেখ করেন, হাওরাঞ্চলের নদ-নদী ও মুক্ত জলাশয় দেশীয় মাছের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। এসব জলাশয়ে মাছের প্রজনন ও বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে দীর্ঘমেয়াদে মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
এ জন্য নির্দিষ্ট সময়ে পোনা অবমুক্তকরণের পাশাপাশি মাছের প্রজনন মৌসুমে আইন মেনে চলা, অবৈধ ও ধ্বংসাত্মক মাছ ধরার পদ্ধতি প্রতিরোধ, জলাশয়ের দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।
তাঁদের মতে, সরকারি দপ্তরের কার্যক্রমের পাশাপাশি মৎস্যজীবী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে হাওরের মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ কার্যক্রম আরও কার্যকর হতে পারে।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মৎস্যসম্পদ রক্ষার প্রত্যাশা
ধলেশ্বরী নদীতে ২৭০ কেজি মাছের পোনা অবমুক্ত করার এ কর্মসূচিকে অষ্টগ্রামের মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এ ধরনের কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদি সুফল নিশ্চিত করতে অবমুক্ত করা পোনার প্রজাতি, বেঁচে থাকার উপযোগী পরিবেশ এবং পরবর্তী সময়ে মাছের উৎপাদন পরিস্থিতির ওপর নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ।
পরিকল্পিতভাবে পোনা অবমুক্তকরণ, জলাশয়ের সুরক্ষা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে হাওরাঞ্চলের প্রাকৃতিক মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে।
দেশীয় মাছের প্রাচুর্য ফিরিয়ে আনা, জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মৎস্যসম্পদ টেকসই রাখার প্রত্যাশায় অষ্টগ্রামে এ উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা।