নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা রাজধানীর চকবাজার ও গুলশান কেন্দ্রিক গড়ে ওঠা ‘নাহিদ গ্রুপ’ নামক একটি ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি, অবৈধ বন্ড ব্যবসা এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতা হত্যার অর্থায়নের চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। গ্রুপের কর্ণধার আনোয়ার হোসেন, ঝন্টু কুমার সাহা ও ফয়সাল হোসেনের নেতৃত্বে এই সিন্ডিকেট গত ১৬ বছরে প্রশাসনের একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে গড়ে তুলেছে সম্পদের পাহাড়, যা সালমান এফ রহমানের মতো রাঘববোয়ালদেরও টেক্কা দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
১. বন্ড জালিয়াতি ও শত শত কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি
অনুসন্ধানে দেখা যায়, নাহিদ এন্টারপ্রাইজ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এনবিআর ও কাস্টমসের অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে বেআইনি বন্ড সুবিধায় লক্ষ লক্ষ টন প্লাস্টিক দানা আমদানি করে। নিয়ম অনুযায়ী এসব দানা রপ্তানিমুখী পণ্যে ব্যবহারের কথা থাকলেও, তারা তা রাতের আঁধারে খোলা বাজারে এবং দেশের বড় বড় শিল্প গ্রুপ (প্রাণ-আরএফএল, স্কয়ার, আকিজ, বেঙ্গল ইত্যাদি) এর কাছে বিক্রি করে দেয়। বর্তমানে নীলফামারী ইপিজেড গোডাউনে তাদের প্রায় ৩.৫ লক্ষ বস্তা প্লাস্টিক দানা মজুত রয়েছে বলে জানা গেছে।
২. ফাইল গায়েব ও ঘুষের মহোৎসব
অভিযোগ রয়েছে, নাহিদ এন্টারপ্রাইজের নামে ২৭৫ কোটি টাকা এবং প্লাস্টিক কনসার্নের নামে ১২০ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকির মামলা থাকলেও মোটা অংকের ঘুষের বিনিময়ে তা ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে। ভ্যাট কর্মচারী কেতাব আলী (যাত্রাবাড়ী থানার হত্যা মামলার আসামি) এবং রেভিনিউ অফিসার মাজেদুল ইসলামের মাধ্যমে প্রায় ২৪ কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে এই ফাইলগুলো নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এমনকি ভ্যাট গোয়েন্দা কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধেও ১০ কোটি টাকার বিনিময়ে ফাইল গায়েব করার অভিযোগ উঠেছে।
৩. সিন্ডিকেটের সম্পদের পাহাড় (আংশিক তালিকা):
এই সিন্ডিকেট অবৈধ অর্থ দিয়ে ঢাকা ও আশেপাশে শত শত কোটি টাকার স্থাবর সম্পত্তি গড়ে তুলেছে:
বকশিবাজার ও চকবাজার: ৩৯/১ উমেশ দত্ত রোডে ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ১০ তলা ভবন, ১০/এ গির্দা উর্দু রোডে ১০ তলা ভবন এবং ৩৪/১ উমেশ দত্ত রোডে ৬ তলা ভবন।
গুলশান ও বনানী: গুলশান-১ এর ২৯ নং রোডে ১০ তলা ভবন, গুলশান-২ এর ৫০ নং রোডে ডুপ্লেক্স জলসাঘর এবং বনানী-গুলশানে ঝন্টু কুমার সাহার ৩৮টি ফ্ল্যাট।
রিসোর্ট ও বাগানবাড়ি: পূর্বাচল, গাজীপুর ও কালিয়াকৈরে প্রায় ৭-৮টি বিশাল রিসোর্ট ও জলসাঘর। এর মধ্যে গাজীপুর সদরের ২৩৩ শতাংশের রিসোর্ট এবং পূর্বাচলে ৭০০ শতাংশের রিসোর্ট উল্লেখযোগ্য।
বাণিজ্যিক গুদাম: কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ ও ঢাকেশ্বরীতে হাজার হাজার স্কয়ার ফিটের একাধিক গোডাউন।
৪. জুলাই হত্যাকাণ্ডে অর্থায়ন ও দেশত্যাগ
সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগ হলো, জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে এই সিন্ডিকেট আওয়ামী লীগ নেতাদের কোটি কোটি টাকা জোগান দিয়েছে। আন্দোলনের সময় ছাত্র হত্যার সাথে আনোয়ার হোসেন ও ফয়সাল হোসেন সরাসরি জড়িত বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ৫ই আগস্ট সরকার পতনের পর তারা আত্মগোপনে চলে গেলেও বর্তমানে পুনরায় ফিরে এসে অবৈধ ব্যবসা সচল করার চেষ্টা করছে।
৫. অর্থ পাচার ও দ্বৈত নাগরিকত্ব
সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতা ঝন্টু কুমার সাহা হুন্ডির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা ভারতে পাচার করেছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর আওয়ামী লীগের পদ ব্যবহার করে তিনি প্রশাসনকে জিম্মি করে রাখতেন। তার সকল আত্মীয়-স্বজন ভারতে বসবাস করায় অর্জিত সম্পদের বড় অংশই সীমান্ত পার করা হয়েছে।

তদন্তের দাবি:
সচেতন মহলের দাবি, দ্রুত এই সিন্ডিকেটের সদস্যদের পাসপোর্ট জব্দ করে তাদের এনআইডি (আনোয়ার: ৭৩০৮২৫০৩৩৬, ঝন্টু: ৩২৮৯০২৭৩৫৫, ফয়সাল: ৬৮৫৮২৩৪৮৬৪) এর অধীনে থাকা সকল ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে। একই সাথে বন্ড জালিয়াতি রোধে নীলফামারী ইপিজেড ও চকবাজারের গোপন নথিপত্র উদ্ধারে যৌথ বাহিনীর অভিযান জরুরি।
৬. প্রচলিত আইনে অপরাধের গুরুত্ব ও কাঙ্ক্ষিত শাস্তি
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নাহিদ গ্রুপের এই সিন্ডিকেট যে পর্যায়ের অপরাধ করেছে, তা রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে নিম্নোক্ত শাস্তির দাবি জানানো হচ্ছে:
রাজস্ব ফাঁকি ও বন্ড জালিয়াতি: কাস্টমস অ্যাক্ট ও ভ্যাট আইন অনুযায়ী, ফাঁকি দেওয়া অর্থের সমপরিমাণ বা তার কয়েকগুণ জরিমানা এবং জড়িতদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হওয়া উচিত। যেহেতু তারা ১০০০ কোটি টাকার উপরে ফাঁকি দিয়েছে, তাই তাদের সকল বাণিজ্যিক লাইসেন্স চিরতরে বাতিল করতে হবে।
মানি লন্ডারিং ও অবৈধ সম্পদ: মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী, অবৈধভাবে অর্জিত সকল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি (গুলশান-চকবাজারের ভবন, রিসোর্ট ও ব্যাংক ব্যালেন্স) রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বাজেয়াপ্ত (Confiscate) করতে হবে। হুন্ডির মাধ্যমে ভারতে টাকা পাচারের দায়ে কঠোর শ্রমদণ্ড প্রদান করা প্রয়োজন।
জুলাই হত্যাকাণ্ডে অর্থায়ন ও খুনের দায়: দণ্ডবিধি (Penal Code) অনুযায়ী, ছাত্র আন্দোলনে অর্থায়ন এবং হত্যার মদতদাতা হিসেবে আনোয়ার হোসেন, ফয়সাল হোসেন ও ঝন্টু কুমার সাহাকে ফাঁসি অথবা আমৃত্যু কারাদণ্ডের আওতায় আনতে হবে।
অসাধু কর্মকর্তাদের শাস্তি: কেতাব আলী, মাজেদুল ইসলাম ও জাহাঙ্গীর আলমের মতো যারা এই মাফিয়াদের রক্ষা করেছে, তাদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করে ফৌজদারি মামলায় বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।
বিশেষ পর্যবেক্ষণ: এই চক্রটি যেহেতু ভারতীয় নাগরিকত্ব ব্যবহার করে দেশ ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করছে, তাই অবিলম্বে তাদের পাসপোর্ট ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা (Look-out Circular) জারি করা এবং ইন্টারপোলের প্রয়োজন হলে সহায়তা নেওয়া জরুরি। এই জাতীয় বেঈমান ও অর্থ চোরদের বিচার না হলে রাষ্ট্রের অর্থনীতি কখনোই নিরাপদ হবে না।
১. দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বরাবর অভিযোগ
দুদক এই সিন্ডিকেটের অবৈধ সম্পদের উৎস ও কর্মকর্তাদের ঘুষ দেওয়ার বিষয়টি তদন্ত করবে।
বরাবর, চেয়ারম্যান, দুর্নীতি দমন কমিশন ১ সেগুনবাগিচা, ঢাকা। বিষয়: নাহিদ গ্রুপ ও তার কর্ণধারদের হাজার কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ।
অভিযুক্ত: আনোয়ার হোসেন (NID: 7308250336), ঝন্টু কুমার সাহা (NID: 3289027355), ফয়সাল হোসেন (NID: 6858234864)। বিবরণ: উল্লেখিত ব্যক্তিরা গত ১৬ বছরে রাজনৈতিক প্রভাবে (হাজী সেলিম ও ওবায়দুল কাদেরের মদতে) বকশিবাজার, গুলশান, গাজীপুর ও পূর্বাচলে ২০টিরও বেশি বহুতল ভবন ও রিসোর্ট তৈরি করেছেন। ভ্যাট কর্মকর্তা কেতাব আলী ও মাজেদুল ইসলামকে ২৪ কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে দুর্নীতির ফাইল গায়েব করেছেন। আবেদন: তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হোক।
২. জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) - সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (CIC)
রাজস্ব ফাঁকি এবং বন্ড জালিয়াতি ধরার জন্য এটি সবচেয়ে শক্তিশালী সংস্থা।
বরাবর, মহাপরিচালক, সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (CIC) রাজস্ব ভবন, আগারগাঁও, ঢাকা। (ইমেইল: cic@nbr.gov.bd) বিষয়: নাহিদ এন্টারপ্রাইজ ও সহযোগী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ১০০০ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির তদন্তের আবেদন।
তথ্যাদি: নাহিদ এন্টারপ্রাইজ, প্লাস্টিক কনসার্ন ও Pinq Plast BD Ltd-এর নামে বন্ডের কাঁচামাল (প্লাস্টিক দানা) অবৈধভাবে খোলা বাজারে বিক্রি করা হয়েছে। বর্তমানে ৩.৫ লক্ষ বস্তা দানা নীলফামারী ইপিজেড-এ অবৈধভাবে মজুত আছে। ২০১৭-২০২১ এর ব্যাংক স্টেটমেন্টে এর প্রমাণ রয়েছে। আবেদন: অবিলম্বে উক্ত গুদামটি সিলগালা করা এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার অনুরোধ করছি।
৩. বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU)
হুন্ডির মাধ্যমে ভারতে টাকা পাচার রোধে এদের ভূমিকা প্রধান।
বরাবর, প্রধান কর্মকর্তা, BFIU বাংলাদেশ ব্যাংক, প্রধান কার্যালয়, মতিঝিল, ঢাকা। বিষয়: ঝন্টু কুমার সাহা ও সিন্ডিকেটের হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচারের অভিযোগ।
বিবরণ: ঝন্টু কুমার সাহা কিশোরগঞ্জ ও ঢাকার ব্যবসা থেকে অর্জিত শত শত কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে ভারতে পাচার করেছেন। তার সকল আত্মীয় ভারতে বসবাস করে। অর্জিত টাকা অবৈধভাবে সীমান্ত পার করা হয়েছে। আবেদন: তাদের মানি লন্ডারিং তদন্ত এবং পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নিন।
৪. পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (CID) - ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম
অর্থনৈতিক জালিয়াতি এবং সিন্ডিকেট দমনে তারা কাজ করে।
বরাবর, অতিরিক্ত আইজিপি, সিআইডি মালিবাগ, ঢাকা। বিবরণ: রাজনৈতিক মাফিয়া হাজী সেলিমের প্রভাবে ভ্যাট অফিসের কর্মকর্তাদের লাঞ্ছিত করা এবং অবৈধ নথিপত্র (উমেশ দত্ত রোড, বকশিবাজারের গোপন আস্তানায়) লুকিয়ে রাখার অভিযোগে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযান প্রয়োজন।