প্রিন্ট এর তারিখঃ নভেম্বর ৬, ২০২৬, ১১:৩৯ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ জুলাই ২১, ২০২৫, ৯:৪৮ পূর্বাহ্ণ
উজ্জীবনী ইনস্টিটিউটে নারী কেলেঙ্কারি ও দুর্নীতির পাহাড় — তদন্ত শুরু হলেও উঠছে একাধিক প্রশ্ন
উজ্জীবনী ইনস্টিটিউটে নারী কেলেঙ্কারি ও দুর্নীতির পাহাড় — তদন্ত শুরু হলেও উঠছে একাধিক প্রশ্ন
হাফিজুর রহমান, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
২১ জুলাই ২০২৫, কালিগঞ্জ
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার উজ্জীবনী ইনস্টিটিউট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইকবাল আলম বাবলুর বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারি, অর্ধ কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্য, রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দলীয় দখলের অভিযোগে শেষ পর্যন্ত তদন্ত শুরু হয়েছে। তবে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—এই তদন্ত এত বিলম্বে কেন? আর একজন শিক্ষক কীভাবে এমন ক্ষমতাবান হয়ে উঠলো?

তদন্ত শুরু হওয়ার কারণ: জনচাপ ও তথ্যপ্রমাণের পাহাড়
বছরের পর বছর ধরে এই বিদ্যালয়ে চলেছে একের পর এক অনিয়ম। স্কুলকে দলীয় অফিসে রূপান্তর, ছাত্রীদের যৌন হয়রানি, টাকা নিয়ে চাকরি—এসব ঘটনা এলাকাবাসীর মুখে মুখে থাকলেও প্রথমে প্রশাসন নিরব ছিল।
তবে ২০২৪ সালের ৩০ অক্টোবর নবম শ্রেণির দুই ছাত্রীকে যৌন হয়রানির ঘটনায় ক্ষোভ সর্বোচ্চে পৌঁছায়। বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী প্রধান শিক্ষককে ঘেরাও করে তার অপসারণ দাবি করলে বিষয়টি জাতীয় মিডিয়ায় উঠে আসে।
- ভুক্তভোগীদের লিখিত জবানবন্দি
- পেনড্রাইভে জমা দেওয়া ভিডিও-ছবি প্রমাণ
- স্থানীয় সাংবাদিকদের সম্মিলিত প্রতিবেদন
- এলাকা জুড়ে গণমাইকিং, বিক্ষোভ, মানববন্ধন
এসব কিছু একসাথে চাপে ফেলে শিক্ষা অধিদপ্তরকে। ফলস্বরূপ, ৬ মাস পরে হলেও গত ২০ জুলাই তদন্ত শুরু করে দুজন প্রধান শিক্ষককে নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি।
তদন্তে বিলম্ব: প্রশাসনিক গাফিলতি, রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও ঘুষের গুঞ্জন
২০২৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি খুলনা বিভাগীয় শিক্ষা উপপরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা পড়ে। এরপর ২৩ মার্চ ৭ দিনের মধ্যে তদন্তের নির্দেশ এলেও কার্যক্রম শুরু হয় ৬ মাস পর! কেন?
- অভিযোগ রয়েছে: প্রথম তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক আকরাম হোসেন মোটা অঙ্কের ঘুষ নিয়ে অভিযুক্তের পক্ষে প্রাথমিক প্রতিবেদন দেন।
- অভিযোগ গোপন রাখতে ব্যর্থ হলে এলাকাবাসী ফের আন্দোলনে নামে।
- স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে একধরনের রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব স্পষ্ট—যার ফলে তদন্ত কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে।
এছাড়া, বিদ্যালয়ের তৎকালীন ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অনুজা মণ্ডল—যিনি শুরুতে কোনো অভিযোগ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান।
অভিযোগের অন্তরালের কাহিনি: শিক্ষা নয়, ক্ষমতা ও ভোগের কেন্দ্রবিন্দু বানানো হয় স্কুলকে
প্রধান শিক্ষক ইকবাল আলম বাবলুর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ এসেছে, সেগুলোর ভিত্তিতে বোঝা যায়—এই প্রতিষ্ঠানটি ছিল মূলত ব্যক্তিগত দুর্নীতির সাম্রাজ্য। তার বিরুদ্ধে আছে—
- ২০১৮ সালে স্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে বিতর্কিত নিয়োগ
- পাঁচটি পদে নিয়োগে প্রায় ৪০ লক্ষাধিক টাকা ঘুষ গ্রহণের লিখিত স্বীকারোক্তি
- আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে যোগসাজশে নিজের ফুফাতো ভাইকে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বানিয়ে রাখেন
- নিজের অফিস কক্ষে দলীয় মিটিং, পোস্টার, নির্বাচনী প্রচার
- স্কুলে নিয়মিত উপস্থিত না থেকে হাজিরা দেখিয়ে বেতন তোলা
- ছাত্রীদের জন্মদিনের নামে ডেকে যৌন হয়রানি, ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়া
- একাধিক বিবাহিত নারীর সঙ্গে আপত্তিকর সম্পর্ক, একবার গর্ভপাতের ঘটনাও রয়েছে
- স্কুলে রাজনৈতিক ক্যাডার ঢুকিয়ে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের হুমকি দেওয়া
তার বিরুদ্ধে আগেও বরখাস্ত হওয়ার ঘটনা আছে—কালিগঞ্জ বালিকা বিদ্যালয়ে এক ছাত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে গর্ভপাত ঘটিয়ে চাকরি হারান, পরে প্রভাব খাটিয়ে ফের চাকরিতে ফিরেন।
তদন্ত শেষ নয়, দায়মুক্তি অসম্ভব নয়
তদন্ত কর্মকর্তা আবুল হাসান আশ্বাস দিয়েছেন, “প্রকৃত সত্য উদঘাটনের ভিত্তিতে প্রতিবেদন দেওয়া হবে।”
তবে এলাকাবাসীর দাবি—“প্রতিবেদন নয়, দ্রুত বিচার ও অপসারণ চাই।”
তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন—যদি সত্য গোপন করা হয়, তাহলে ফের গণআন্দোলনে নামবে গোটা কালিগঞ্জ।
সাতক্ষীরার শিক্ষক সমাজ, প্রশাসন এবং জনসাধারণ এখন তাকিয়ে আছে—এই তদন্ত প্রতিবেদন কোথায় গিয়ে থামে? নাকি সত্যের মুখোমুখি হবে আবারও একটি ধর্ষিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান?
একেবারে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি, ঘুষ, জালিয়াতি, ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো একাধিক অভিযোগে বাংলাদেশ দণ্ডবিধি অনুযায়ী বহু ধারায় মামলা হতে পারে—প্রত্যেকটির জন্য নির্দিষ্ট শাস্তির বিধান আছে। নিচে বিষয়গুলো ধারাবদ্ধভাবে ব্যাখ্যা করছি:
বাংলাদেশ দণ্ডবিধি অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধসমূহ এবং সংশ্লিষ্ট ধারা
১. ছাত্রীদের যৌন হয়রানি / যৌন নিপীড়ন / শ্লীলতাহানি
দণ্ডবিধি ধারা:
- ধারা 354: শ্লীলতাহানি – শাস্তি: ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং জরিমানা।
- ধারা 376/511: ধর্ষণের চেষ্টা – শাস্তি: ৭ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড।
- নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত):
- ধারা ১০ ও ৯(৫): ক্ষমতার অপব্যবহার করে যৌন হয়রানি করলে ৫ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড।
২. ঘুষ গ্রহণ / নিয়োগ বাণিজ্য / দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ
দণ্ডবিধি ধারা:
- ধারা 161–165: সরকারি কর্মচারীর ঘুষ গ্রহণ – শাস্তি: ৩ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা জরিমানা বা উভয়দণ্ড।
- দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪ – ধারা ২৮ ও ২৯:
- সরকারি কর্মচারী হলে: ৭–১৪ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের ক্ষমতা।
৩. প্রতারণা / জালিয়াতি / অসত্য তথ্য উপস্থাপন
দণ্ডবিধি ধারা:
- ধারা 420: প্রতারণার মাধ্যমে প্রতিপত্তি অর্জন – শাস্তি: ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং জরিমানা।
- ধারা 468: জাল নথিপত্র ব্যবহার – শাস্তি: ৭ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড।
৪. ক্ষমতার অপব্যবহার / শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় দখলদারি / ম্যানেজিং কমিটিকে অবৈধভাবে নিয়ন্ত্রণ
- জনগণের কর্মচারীর দায়িত্ব অবহেলা – ধারা 217:
- শাস্তি: ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা জরিমানা।
৫. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিত না থেকে হাজিরা দেওয়া (অসদাচরণ)
সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা ও PE Rules অনুযায়ী:
- বরখাস্ত, চাকরি হতে অপসারণ, বেতন বন্ধ এবং বিভাগীয় মামলা।
৬. একাধিক বিবাহ, অবৈধ সম্পর্ক, স্ত্রী থাকা অবস্থায় অন্য নারীর সঙ্গে সহবাস
ধারা 497 (ব্যভিচার):
- শাস্তি: ৫ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড বা জরিমানা বা উভয়।
অতিরিক্ত বিবেচ্য বিষয় (Aggravating Factors):
- শিক্ষকের মতো দায়িত্বশীল পদের ব্যক্তি কর্তৃক অপরাধ হলে শাস্তি আরও বেশি কঠোর হতে পারে।
- ভিকটিম যদি শিশু বা অপ্রাপ্তবয়স্ক হয়, তাহলে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে আরও কড়া শাস্তি প্রযোজ্য।
সামগ্রিকভাবে কী হওয়া উচিত?
- নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে যৌন হয়রানির অভিযোগে পৃথক মামলা।
- দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে ঘুষ ও অর্থ আত্মসাৎ বিষয়ক তদন্ত ও মামলা।
- শিক্ষা অধিদপ্তরের মাধ্যমে চাকরিচ্যুতি ও আজীবন নিষেধাজ্ঞা।
- সিআইডি / পিবিআই’র মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ ফৌজদারি তদন্ত।
- ভুক্তভোগীদের জন্য মানসিক ও আইনি সহায়তা নিশ্চিতকরণ।
এই শিক্ষক কেবল একজন অপরাধী নয়, পুরো শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতক। তার ক্ষেত্রে নমনীয়তা হবে রাষ্ট্রের প্রতি অবিচার। আইনি বিচারের পাশাপাশি সামাজিক ও নৈতিকভাবে তাকে চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া জরুরি।
প্রস্তুত করেছেন:
নজরদারি ডেস্ক, বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ
স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২১ — দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ এই ওয়েবসাইটের সংবাদ, লেখা, ছবি, ভিডিও ও অন্যান্য কনটেন্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কপি, নকল বা পুনঃপ্রকাশ করা নিষিদ্ধ। অননুমোদিত ব্যবহার প্রযোজ্য কপিরাইট আইনে আইনগত ব্যবস্থা ও শাস্তির আওতাভুক্ত হতে পারে। Copyright © 2021 Daily Bangladesh Prothom Sangbad. All Rights Reserved.