
সালিসের নামে অর্থ নেওয়ার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি, অভিযোগ অস্বীকার চেয়ারম্যানের—মেম্বারেরও দাবি, তাঁকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জড়ানো হচ্ছে
নওগাঁ প্রতিনিধি | দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ
নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার আধাইপুর ইউনিয়নে পারিবারিক জমি বিরোধকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত সালিসি বৈঠককে ঘিরে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এ কে এম রেজাউল কবির পল্টন ও ইউপি সদস্য মাহাতাব আলী প্রামাণিকের বিরুদ্ধে অর্থ গ্রহণের অভিযোগ নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দেড় লাখ টাকার একটি সালিসি মীমাংসা। অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, জমি সংক্রান্ত বিরোধ মীমাংসা করে এক পক্ষকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলেও পুরো অর্থ ভুক্তভোগীর হাতে দেওয়া হয়নি। অভিযোগ অনুযায়ী, ১ লাখ টাকা দেওয়া হলেও বাকি ৫০ হাজার টাকা ‘খাটুনির মজুরি’ হিসেবে চেয়ারম্যানের কাছে রাখা হয়।
অন্যদিকে চেয়ারম্যান এ কে এম রেজাউল কবির পল্টন অভিযোগটিকে মিথ্যা, বানোয়াট ও রাজনৈতিক চক্রান্ত হিসেবে দাবি করে ৫০ হাজার টাকা নিজের কাছে রাখার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এ ঘটনায় ইউপি সদস্য মাহাতাব আলী প্রামাণিকের বিরুদ্ধেও সালিসের আগে ২০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ তোলা হলেও তিনিও তা সরাসরি অস্বীকার করেছেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই অভিযোগের পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আরেকটি প্রশ্নও সামনে এসেছে। মাহাতাব আলী প্রামাণিক ভবিষ্যতে আধাইপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন—এমন আলোচনা যদি এলাকায় তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে তাঁকে ঘিরে সাম্প্রতিক অভিযোগ ও প্রচারণার পেছনে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার রয়েছে কি না, সেটিও নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁর সমর্থকেরা।
তবে চেয়ারম্যান নির্বাচন বা দলীয় মনোনয়ন নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের তথ্য না থাকায় বিষয়টি রাজনৈতিক মহলে চলমান আলোচনা ও সমর্থকদের দাবির পর্যায়েই রয়েছে।
সালিসে দেড় লাখ টাকা, হাতে দেওয়া হলো এক লাখ—বাকি ৫০ হাজার কোথায়?
অভিযোগকারী নুর ইসলামের স্ত্রী তাহমিনা বেগমের ভাষ্য অনুযায়ী, বৈকুণ্ঠপুর গ্রামে জমি সংক্রান্ত পারিবারিক বিরোধ মীমাংসার জন্য দুই দিন ধরে সালিস অনুষ্ঠিত হয়।
তাঁর দাবি, গত ১৭ আগস্ট ও ১৮ আগস্ট বৈকুণ্ঠপুর গ্রামে তাঁদের বাড়ির সামনে চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যদের উপস্থিতিতে সালিস বসে। দীর্ঘ আলোচনার পর বিরোধ মীমাংসা করা হয়।
মীমাংসার শর্ত অনুযায়ী নুর ইসলামকে তাঁর জমির একটি অংশ ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয় বলে অভিযোগকারী পক্ষের দাবি।
তাহমিনা বেগমের দাবি, ১৯ আগস্ট ওই টাকা আধাইপুর ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যানের কক্ষে দেওয়া হয়। পরদিন রাতে তাঁদের ডেকে এনে তাঁর হাতে ১ লাখ টাকা তুলে দেওয়া হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, বাকি ৫০ হাজার টাকা চেয়ারম্যান নিজের কাছে রেখে দেন।
তাহমিনা বেগমের দাবি, চেয়ারম্যানের কাছে বাকি টাকা রাখার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সালিসে তাঁদের ‘খাটুনির’ কথা উল্লেখ করেন।
তবে এই বক্তব্যের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। চেয়ারম্যানও অভিযোগটি অস্বীকার করেছেন।
‘আমরা খেটেছি, আমরা খাব না?’—অভিযোগকারীর দাবি
তাহমিনা বেগমের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর হাতে ১ লাখ টাকা দেওয়ার পর বাকি ৫০ হাজার টাকা চেয়ারম্যান নিজের কাছে রেখে দেন এবং সালিসে তাঁদের পরিশ্রমের বিষয়টি উল্লেখ করেন।
এই বক্তব্য সামনে আসার পরই মূল প্রশ্ন উঠেছে—ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা সালিসে অংশগ্রহণকারী জনপ্রতিনিধিরা বিরোধ মীমাংসার বিনিময়ে ব্যক্তিগতভাবে ‘খাটুনির মজুরি’ হিসেবে অর্থ গ্রহণ করতে পারেন কি না।
বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে।
তবে অভিযোগটি সত্য কি না এবং অর্থটি কী উদ্দেশ্যে রাখা হয়েছিল—তা নির্ধারণের জন্য নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
‘সালিসের খরচ হয়েছিল ১৫ হাজার টাকা’—আরও নানা দাবি
অভিযোগকারী পক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, সালিস সংক্রান্ত কিছু ব্যয় হয়েছিল। তাঁদের দাবি, অপর পক্ষের প্রায় ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল এবং বকশিশ দেওয়ার কথাও ছিল।
স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, নুরে আলম বাবুর পক্ষে মুমিন নামে এক ব্যক্তি চেয়ারম্যানের কাছে টাকা পৌঁছে দিয়েছিলেন।
তবে এসব তথ্যের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে নেই। ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও নথি যাচাই করা জরুরি।
মাহাতাব মেম্বারের বিরুদ্ধে ২০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ
একই সালিসকে কেন্দ্র করে ইউপি সদস্য মাহাতাব আলী প্রামাণিকের বিরুদ্ধেও ২০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
তবে মাহাতাব আলী প্রামাণিক অভিযোগটি সরাসরি অস্বীকার করেছেন।
তাঁর দাবি, অর্থ গ্রহণের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই এবং টাকা লেনদেনের সময়ও তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না।
তিনি অভিযোগটিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে দাবি করেছেন।
ফলে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ওঠা ৫০ হাজার টাকা এবং মেম্বারের বিরুদ্ধে ওঠা ২০ হাজার টাকার অভিযোগ—দুই বিষয়েই অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট বিরোধ রয়েছে।
আগেও সালিসে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ?
স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, চেয়ারম্যান এ কে এম রেজাউল কবির পল্টনের বিরুদ্ধে এর আগেও সালিসের নামে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল।
তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক মাস আগে বৈকুণ্ঠপুর গ্রামের মিষ্টিআলার মোড় এলাকার একটি জমি বিরোধের সালিসে এক পক্ষের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
এ ছাড়া বাল্যবিবাহসহ বিভিন্ন পারিবারিক বিরোধ মীমাংসার ক্ষেত্রেও চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয় কেউ কেউ দাবি করেছেন।
উত্তর আধাইপুর হিন্দুপাড়ায় প্রেমিক-প্রেমিকার সম্পর্ক ও গর্ভধারণ সংক্রান্ত একটি সালিসে লক্ষাধিক টাকার লেনদেনের অভিযোগও স্থানীয়ভাবে রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে এসব পুরোনো অভিযোগের কোনোটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলোর পক্ষে প্রকাশ্য নথি বা আদালতের রায় প্রতিবেদকের হাতে নেই।
তাই এসব অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা উচিত, প্রমাণিত সত্য হিসেবে নয়।
গ্রাম আদালত নাকি ব্যক্তিগত সালিস—ক্ষমতার সীমা কোথায়?
সালিস ও গ্রাম আদালতের কার্যক্রম নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে।
ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিরা যখন কোনো বিরোধ মীমাংসায় ভূমিকা রাখেন, তখন সেই প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিগতভাবে অর্থ গ্রহণের বৈধতা কোথায়—এ প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।
বদলগাছী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসরাত জাহান ছনির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, এ বিষয়ে তাঁর কাছে লিখিত অভিযোগ আসেনি। তবে গ্রাম আদালতে বিচার করার পর ‘খাটুনির নামে’ মজুরি নেওয়ার কোনো বিধান নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও জানান, এমন ঘটনা ঘটে থাকলে এবং লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ‘আধিপত্য বিস্তার’-এর অভিযোগ
এদিকে চেয়ারম্যান এ কে এম রেজাউল কবির পল্টনকে ঘিরে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আরও নানা অভিযোগ ও আলোচনা রয়েছে বলে স্থানীয় কয়েকজন দাবি করেছেন।
তাঁদের কেউ কেউ অভিযোগ করেন, ইউনিয়ন পর্যায়ে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে চেয়ারম্যানের প্রভাববলয় তৈরি হয়েছে।
এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে বিভিন্ন সালিস ও বিরোধে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে বলে তাঁরা দাবি করেছেন।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে নেই এবং চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ওঠা এসব দাবির বিষয়ে তাঁর বিস্তারিত বক্তব্যও এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
ফলে এসব বক্তব্যকে স্থানীয়দের অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
বিএনপির নাম ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ—প্রমাণ কোথায়?
স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের একটি অংশের অভিযোগ, চেয়ারম্যান রাজনৈতিক পরিচয় ও দলের নাম ব্যবহার করে স্থানীয় বিভিন্ন বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন।
তবে কোনো রাজনৈতিক দলের নাম ব্যবহার করে ব্যক্তিগত বা বেআইনি সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর হওয়ায় এর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রয়োজন।
শুধু রাজনৈতিক পরিচয় থাকা বা কোনো দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততার দাবি থেকে কাউকে কোনো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত করা যায় না।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দলীয় নেতাদের বক্তব্য এবং চেয়ারম্যানের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ।
মাহাতাব মেম্বারকে ‘ফাঁসানোর চেষ্টা’—সমর্থকদের দাবি
সালিসের ঘটনায় মাহাতাব আলী প্রামাণিকের নাম আসার পর তাঁর সমর্থকদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
তাঁদের দাবি, মাহাতাব দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং মাঠপর্যায়ে তাঁর একটি নিজস্ব গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
সমর্থকদের মতে, তিনি ভবিষ্যতে আধাইপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন—এমন আলোচনা এলাকায় তৈরি হয়েছে। আর সেই রাজনৈতিক সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করেই একটি পক্ষ তাঁর ভাবমূর্তি নষ্ট করতে চাইছে।
তাঁদের অভিযোগ, একটি বিতর্কিত সালিসি ঘটনাকে কেন্দ্র করে মাহাতাবকে এমনভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে, যাতে ভবিষ্যতে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে।
তবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানোর অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
ফলে এটিকে মাহাতাবের সমর্থকদের অভিযোগ হিসেবেই উপস্থাপন করা হচ্ছে।
১৭ বছরের রাজনৈতিক পথচলার দাবি
মাহাতাব আলী প্রামাণিকের সমর্থকদের দাবি, তিনি প্রায় ১৭ বছর ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।
তাঁদের ভাষ্য, রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি দীর্ঘ সময় ধরে মাঠপর্যায়ে দলীয় কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন।
সভা, সমাবেশ, সাংগঠনিক কার্যক্রম ও স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাঁর উপস্থিতির কথা উল্লেখ করে সমর্থকেরা তাঁকে পুরোনো মাঠকর্মী হিসেবে দাবি করেন।
তাঁদের মতে, দীর্ঘদিন রাজনীতিতে থাকার কারণে ইউনিয়নের একটি অংশের মানুষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ও গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে।
তবে রাজনৈতিক জীবনের এসব দাবির বিষয়ে দলীয় নথি বা আনুষ্ঠানিক প্রত্যয়ন প্রতিবেদকের হাতে না থাকায় তা সংশ্লিষ্ট সমর্থকদের বক্তব্য হিসেবেই বিবেচিত হবে।
চেয়ারম্যান হওয়ার সম্ভাবনাই কি বিরোধের কারণ?
স্থানীয় রাজনৈতিক আলোচনায় এখন সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি ঘুরছে তা হলো—মাহাতাব আলী প্রামাণিক ভবিষ্যতে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করতে পারেন—এমন সম্ভাবনার কারণেই কি তাঁকে ঘিরে বিরোধ তৈরি হয়েছে?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
কারণ চেয়ারম্যান পদে তাঁর প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা দলীয় মনোনয়ন নেই।
তবে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা যদি থেকেই থাকে, তাহলে অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণাকে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে আলাদা করে দেখা কঠিন হতে পারে।
তাই ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি এর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের কেউ কেউ।
অভিযোগ সত্য হলে ব্যবস্থা, মিথ্যা হলে অপপ্রচারকারীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা
সচেতন মহলের মতে, একজন জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে অর্থ গ্রহণের অভিযোগ উঠলে সেটি তদন্ত হওয়া উচিত।
অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও প্রশাসনিক বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
অন্যদিকে অভিযোগ যদি মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়, তাহলে কাউকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা তথ্য প্রচারের বিষয়টিও তদন্ত করা প্রয়োজন।
একজন জনপ্রতিনিধির জবাবদিহিতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি একজন রাজনৈতিক কর্মীর বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে তাঁর সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাবমূর্তি নষ্ট করার চেষ্টাও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
নির্বাচনী রাজনীতিতে শেষ কথা জনগণের
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকা স্বাভাবিক।
কেউ চেয়ারম্যান হতে চাইবেন, কেউ অন্য প্রার্থীকে সমর্থন করবেন—এটাই গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বাভাবিক চিত্র।
কিন্তু প্রতিযোগিতা যদি ব্যক্তিগত আক্রমণ, মিথ্যা তথ্য, অপপ্রচার কিংবা প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের পর্যায়ে চলে যায়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো এলাকার রাজনৈতিক পরিবেশ।
তাই মাহাতাব আলী প্রামাণিক ভবিষ্যতে চেয়ারম্যান প্রার্থী হবেন কি না, সেটি তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, সংশ্লিষ্ট দলের সিদ্ধান্ত এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিষয়।
একইভাবে বর্তমান চেয়ারম্যান এ কে এম রেজাউল কবির পল্টনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও তদন্ত ছাড়া সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
---
তদন্তেই বেরিয়ে আসুক প্রকৃত সত্য
বৈকুণ্ঠপুরের সালিসে দেড় লাখ টাকার মধ্যে কেন ১ লাখ টাকা দেওয়া হলো এবং বাকি ৫০ হাজার টাকার প্রকৃত হিসাব কী—এ প্রশ্নের উত্তর এখন সবচেয়ে জরুরি।
অর্থটি যদি সালিসের বৈধ খরচ হয়ে থাকে, তার লিখিত হিসাব কোথায়?
যদি বকশিশ হয়ে থাকে, সেটি কে দিয়েছেন এবং কী উদ্দেশ্যে?
আর যদি ব্যক্তিগতভাবে নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে তার আইনগত ভিত্তি কী?
একইভাবে মাহাতাব আলী প্রামাণিকের বিরুদ্ধে ২০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগেরও প্রমাণ রয়েছে কি না—সেটিও তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
কারণ অভিযোগের সত্যতা যেমন উদঘাটন করা দরকার, তেমনি মিথ্যা অভিযোগের মাধ্যমে কাউকে রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে কি না, সেটিও অনুসন্ধানের দাবি রাখে।
শেষ কথা
আধাইপুর ইউনিয়নের এই ঘটনা এখন আর শুধু একটি জমি বিরোধের সালিসকে কেন্দ্র করে ওঠা অর্থ লেনদেনের অভিযোগে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জনপ্রতিনিধির জবাবদিহিতা, সালিসি ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং একজন ইউপি সদস্যের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সম্ভাবনাকে ঘিরে নানা প্রশ্ন।
চেয়ারম্যান এ কে এম রেজাউল কবির পল্টন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ইউপি সদস্য মাহাতাব আলী প্রামাণিকও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অর্থ গ্রহণের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
অন্যদিকে অভিযোগকারী পক্ষ তাদের বক্তব্যে অটল।
এই অবস্থায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিচার নয়—প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, নথিপত্র যাচাই, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য।
সত্য যদি অভিযোগকারীর দাবির পক্ষে থাকে, তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা হোক। আর অভিযোগ যদি মিথ্যা বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়, তাহলেও প্রকৃত সত্য প্রকাশ্যে আসুক।
কারণ গণতন্ত্রে জনপ্রতিনিধির ক্ষমতার উৎস জনগণ, আর রাজনৈতিক নেতৃত্বের চূড়ান্ত বিচারকও জনগণই।
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ কোনো পক্ষের অভিযোগকে আদালত কর্তৃক প্রমাণিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করছে না। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য ও প্রমাণ যাচাই করে পরবর্তী প্রতিবেদন প্রকাশের সুযোগ থাকবে।