আহসান উল্লাহ খান বিশেষ প্রতিনিধি
ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেডের আগামী ২৭ আগস্ট ২০২৬ অনুষ্ঠেয় বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) স্থগিত হওয়াকে কেন্দ্র করে কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। কয়েকজন পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডারের আপত্তি, পরিচালনা পর্ষদের গুরুত্বপূর্ণ সভায় কয়েকজন সদস্যের অনুপস্থিতি এবং ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে উত্থাপিত নানা অভিযোগের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি গড়িয়েছে আদালত পর্যন্ত।
প্রাপ্ত তথ্য ও আদালত-সংক্রান্ত নথির বরাত দিয়ে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ২৪ আগস্ট এজিএম আয়োজনের বিষয়ে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ৩১ আগস্ট আপিল বিভাগে শুনানির দিন ধার্য রয়েছে বলে জানা গেছে। আদালত-সংক্রান্ত নথিতে আইনজীবী হিসেবে মি. মিনাল হোসাইনের নাম উল্লেখ রয়েছে। এজিএম আয়োজনের বিষয়ে ‘স্ট্যাটাস কো’ সংক্রান্ত বিষয়ও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এজিএম স্থগিত হওয়ার পর কোম্পানিটির বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের কাঠামো, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং ব্যবস্থাপনার কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে যেসব পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডার নিজেদের বঞ্চিত বলে দাবি করছেন, তারা এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার দ্রুত হস্তক্ষেপের মাধ্যমে কোম্পানিটির বোর্ড ও ব্যবস্থাপনা কাঠামো পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন।
পরিচালনা পর্ষদের সভায় অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগকারীদের দাবি, কোম্পানিটির চেয়ারম্যান সাবেক মেয়র সাঈদ খোকনসহ তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্য বিগত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বোর্ড সভায় উপস্থিত ছিলেন না। তাদের দাবি, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের উপস্থিতি ও সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একইসঙ্গে কোম্পানির ব্যবস্থাপনায় থাকা আহসানুল চৌধুরী এবং কোম্পানি সচিব এহসানুল হক-এর বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা, আর্থিক অনিয়মসহ বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন করেছেন অভিযোগকারীরা।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট অফিসে গিয়ে সিও বা কোম্পানি সচিবের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও সাক্ষাৎ সম্ভব হয়নি বলে প্রতিবেদক জানিয়েছেন।
গুরুত্বপূর্ণভাবে, উত্থাপিত এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এই প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।
আইডিআরএতে অভিযোগ, এরপর আদালতের দ্বারস্থ
বঞ্চিত পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডারদের দাবি, পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে তারা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)-এর কাছেও লিখিত অভিযোগ করেছেন।
তাদের অভিযোগ, নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে বিষয়গুলো উপস্থাপন করা হলেও প্রত্যাশিত গতিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এর পরিপ্রেক্ষিতেই কয়েকজন পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডার আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন।
এখন আদালতের আদেশে এজিএম স্থগিত হওয়ায় বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা, আদালতের চলমান আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থাও তার নিজস্ব আইনগত ক্ষমতার আওতায় অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখবে।
বোর্ড সংস্কারের দাবি কেন
ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে বঞ্চিত পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডারদের একটি অংশ আরও বেশ কিছু অভিযোগ সামনে এনেছেন।
তাদের অভিযোগের মধ্যে রয়েছে—
- স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নিয়োগের অভিযোগ;
- অতিরিক্ত বেতন-ভাতা প্রদানের অভিযোগ;
- কমিশন প্রদানে অনিয়মের অভিযোগ;
- দাবি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ;
- একই প্রতিষ্ঠানে একাধিক সার্ভার ব্যবহারের অভিযোগ;
- পরিচালনা পর্ষদের কার্যক্রম ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন।
তবে এসব অভিযোগের প্রতিটি বিষয়ই নথিপত্র, নিরীক্ষা, সংশ্লিষ্ট রেকর্ড এবং স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগ ওঠা মানেই তা প্রমাণিত—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্ত চায় সংশ্লিষ্টরা
বঞ্চিত পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডারদের বক্তব্য, কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে যদি একাধিক অভিযোগ থাকে, তাহলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
তাদের মতে, পরিচালনা পর্ষদের বৈধতা, সভায় উপস্থিতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া, ব্যবস্থাপনার আর্থিক কার্যক্রম, নিয়োগ ও বেতন-ভাতা, কমিশন প্রদান এবং দাবি নিষ্পত্তির মতো বিষয়গুলো নথিপত্রের ভিত্তিতে পর্যালোচনা করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
বিশেষ করে একটি বীমা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে হাজারো গ্রাহক, পলিসিধারী, বিনিয়োগকারী এবং শেয়ারহোল্ডারের স্বার্থ জড়িত থাকায় অভিযোগগুলোকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি
বীমা খাতসংশ্লিষ্ট কয়েকজন বিশেষজ্ঞের মতে, কোনো বীমা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলতে থাকলে তার প্রভাব প্রতিষ্ঠানের সুশাসন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং গ্রাহকসেবার ওপর পড়তে পারে।
তাদের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্ব হলো অভিযোগগুলোকে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগত বিরোধ হিসেবে না দেখে নথি, আইন, বিধি ও প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের ভিত্তিতে পর্যালোচনা করা।
অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। তবে কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং নথিপত্র যাচাই করা জরুরি।
আদালতের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি আইডিআরএর পদক্ষেপের প্রত্যাশা
বঞ্চিত পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডারদের দাবি, আদালতের চলমান কার্যক্রম তার নিজস্ব গতিতে চলবে। তবে এর পাশাপাশি আইডিআরএ তার নিয়ন্ত্রক ক্ষমতার আওতায় কোম্পানিটির সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে পারে।
তাদের প্রত্যাশা, কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদের বৈধতা, দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা, বোর্ড সভায় অংশগ্রহণ, ব্যবস্থাপনার কার্যক্রম এবং উত্থাপিত আর্থিক ও প্রশাসনিক অভিযোগগুলো দ্রুত যাচাই করা হবে।
তাদের ভাষ্য, অভিযোগ তদন্তে যদি কোনো অনিয়ম বা বিধিবহির্ভূত কার্যক্রমের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। এতে কোম্পানিটির অভ্যন্তরীণ বিরোধের অবসানের পাশাপাশি গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডারদের আস্থাও পুনরুদ্ধার হতে পারে।
এখন নজর আদালত ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার দিকে
২৭ আগস্টের নির্ধারিত এজিএম স্থগিত হওয়ার পর এখন সংশ্লিষ্টদের নজর ৩১ আগস্টের আপিল বিভাগের শুনানি এবং আইডিআরএর সম্ভাব্য পদক্ষেপের দিকে।
একদিকে আদালতের আদেশ ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া, অন্যদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিজস্ব তদন্ত ও তদারকি—দুই দিকেই এখন গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্ট পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডাররা।
ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সত্যতা শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়ায়, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, নিরীক্ষা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্ত এবং আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর।
গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থই সর্বাগ্রে
বীমা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার স্থিতিশীলতা কেবল অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক বিষয় নয়; এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকে পলিসিধারী, গ্রাহক, শেয়ারহোল্ডার ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ।
তাই ইসলামী ইন্স্যুরেন্সকে ঘিরে চলমান বিরোধ ও অভিযোগের দ্রুত, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং আইনসম্মত নিষ্পত্তি এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর তদারকি ও প্রয়োজনীয় তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা সামনে আসবে—এমনটাই প্রত্যাশা বঞ্চিত পরিচালক, শেয়ারহোল্ডার এবং সংশ্লিষ্ট মহলের।
তবে প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলো অভিযোগকারীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে তুলে ধরা হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা আদালত, নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্ত বা সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের মাধ্যমে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে সংযোজন করা হবে।